| |

সর্বশেষঃ

তারামন বিবির বিদায়

আপডেটঃ ৬:১৫ অপরাহ্ণ | ডিসেম্বর ০৪, ২০১৮

পরপারে চলে গেলেন তারামন বিবি বীরপ্রতীক। শুক্রবার রাতে কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার শংকর মাধবপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। এই নারী মুক্তিযোদ্ধা দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। শনিবার স্থানীয় উপজেলা পরিষদ মাঠে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হন রণাঙ্গনের এই বীরকন্যা। বিজয়িনী নারী বিজয়ের মাসের প্রথম প্রহরেই চলে গেছেন অনন্তলোকে। তারামন বিবির মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পীকার।

কুড়িগ্রামের শংকর মাধবপুরে ১১ নম্বর সেক্টরে কমান্ডার আবু তাহেরের অধীনে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তারামন বিবি। মুহিব হাবিলদার নামে এক মুক্তিযোদ্ধা তাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। মুহিব তারামনের গ্রামের পাশের একটি ক্যাম্পের দায়িত্বে¡ ছিলেন। প্রথম দিকে তারামনের দায়িত্ব ছিল ক্যাম্পে রান্নাবান্নার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করা। তাদের অস্ত্র লুকিয়ে রাখা। পাকিস্তানীদের খবর সংগ্রহের দায়িত্ব ছিল তার। এই কিশোরীর সাহস ও শক্তির পরিচয় পেয়ে মুহিব তাকে অস্ত্র চালনা শেখান। এরপর তারামন অস্ত্র হাতে সম্মুখযুদ্ধেও অংশ নেন। তিনি একাধিক সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে তার বীরত্ব প্রকাশ করেছেন, কখনও কখনও মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও বেঁচে গিয়েছিলেন। দুর্ধর্ষ সেই কিশোরীর অসীম সাহসিকতার জন্য ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকার তাকে বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত করে। খেতাব দেয়া হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর হাতে তা তুলে দিতে লেগে যায় দীর্ঘ দুই যুগ। নিভৃত জীবন যাপন করা এই সাহসী নারী দুই যুগেও এই খেতাবপ্রাপ্তির কথা জানতে পারেননি। ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বিমল কান্তি দে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান আলী ও রাজিবপুর কলেজের সহকারী অধ্যাপক আব্দুস সবুর ফারুকীর সহায়তায় তাকে খুঁজে বের করেন। তারপর নারী সংগঠনগুলো তারামন বিবিকে ঢাকায় নিয়ে আসে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার পুরস্কার হিসেবে দেশে মাত্র দু’জন নারী বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। তারামন বিবি ও ক্যাপ্টেন সিতারা রহমান। তারামন বিবি অতি অল্প বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে যে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার কোদালকাঠি ইউনিয়নের কাছারিপাড়ার শংকর মাধবপুর গ্রামে তারামন বিবির জন্ম। তারামন বিবি স্বামী, এক ছেলে ও এক মেয়েসহ পরিবারের সদস্যদের রেখে গেছেন।

বীরপ্রতীক তারামন বিবি শুধু নারী সমাজের নন, তিনি সমগ্র বাঙালী জাতির গর্ব। যুদ্ধের ময়দানে কখনই নিজের জন্য ভাবেননি তিনি। বহুবার পাকিস্তানী বাহিনী তাদের ক্যাম্প আক্রমণ করেছে, ভাগ্যের জোরে তিনি বেঁচেও গেছেন। কিন্তু শেষ বয়সে নানা ব্যাধির কাছে হেরে গিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন এই নারী মুক্তিযোদ্ধা। জাতি তার এই অবদান কখনও ভুলবে না। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে আজ যে উন্নয়নশীল দেশের শর্ত পূরণ করেছেÑ তার প্রারম্ভিক ইতিহাসটি রচনা করেছেন তারামন বিবি ও তার মতো অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আমাদের যা দিয়েছেন, তা ফেরত দিতে হবে শ্রদ্ধা আর সম্মানের মধ্য দিয়ে। তার স্মৃতিকে ধরে রাখার মধ্য দিয়ে। দেশের নতুন ও অনাগত প্রজন্ম যাতে মুক্তিযুদ্ধে তার এবং তার মতো অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার অবদানের কথা ভালভাবে জানতে পারে, সেজন্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সকলের জীবন ও কৃতিত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা জরুরী।

আমরা বিশ্বাস করি, জাতি এবং স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষ চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে মুক্তিযুদ্ধের সকল বীরকে। তারামন বিবির অবদান চির অম্লান থাকুক এই প্রত্যাশা সবার।

আরোও পড়ুন...

HostGator Web Hosting