| |

সর্বশেষঃ

আবারো ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগানে রাজপথ কাপছে, পরীক্ষা বন্ধ

আপডেটঃ ১:১৮ অপরাহ্ণ | ডিসেম্বর ০৫, ২০১৮

নিজস্ব প্রতিবেদক : ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্রি অধিকারীর মৃত্যুর ঘটনায় দোষীদের বিচার ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের অপসারণ দাবিতে দ্বিতীয় দিনের মতো বুধবারও বিক্ষোভ করছেন অভিভাবকরা ও শিক্ষার্থীরা। বুধবার কোনো ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে না বলে মঙ্গলবারই ঘোষণা দেয়।

আজ সকাল থেকে রাজধানীর বেইলি রোডের ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের প্রধান ক্যাম্পাসের সামনে অবস্থান নিয়েছেন তারা। পরীক্ষা বর্জন করে রাজপথে নেমে আসে শিক্ষার্থীরা। অভিভাবকরাও যোগ দিয়েছেন তাদের সঙ্গে। শিক্ষামন্ত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিন দিনের মধ্যে সুষ্ঠু বিচার না হলে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলছেন তারা। এছাড়া কলেজ অধ্যক্ষ ও শাখাপ্রধানের পূর্ণ বরখাস্ত, গভর্নিং বডি বাতিল চেয়েছে তারা।

ভিকারুননিসার ক্যাম্পাস ও বাইরের সড়কে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিজ’ (আমরা ন্যায় বিচার চাই) স্লোগান দিচ্ছে তারা। এছাড়া, নানা ধরনের প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড তৈরি করে তা ধরে রেখেছে শিক্ষার্থীরা।

তাদের যেসব দাবির মধ্যে রয়েছে- স্কুলটির প্রিন্সিপাল নাজনীন ফেরদৌস ও প্রভাতী শাখার প্রধান শিক্ষক জিন্নাত আরার স্থায়ী বহিষ্কার, গভর্নিং বডি বাতিল করা ও আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারীদের উপযুক্ত আইনে বিচার করা। শিক্ষামন্ত্রীর দেওয়া আশ্বাস তিন দিনের মধ্যে বাস্তবায়িত না হলে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

এদিকে স্পর্শকাতর এ ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ ইতোমধ্যে পৃথক পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। এছাড়াও হাইকোর্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে। অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির প্রভাতী শাখার প্রধান জিনাত আরাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিসও দেয়া হয়েছে।

এদিকে গতকাল উত্তাল পরিবেশের মধ্যেই গতকাল নির্ধারিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে অনেকেই পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারি। তার বার্ষিক পরীক্ষা চলমান।

তার বাবা দিলীপ অধিকারী বলেন, শিক্ষকদের অভিযোগ অনুযায়ী গত রোববার সমাজবিজ্ঞান পরীক্ষা চলাকালে অরিত্রীর কাছে নকলে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার হয়েছে। এজন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবক হিসেবে আমাদের ডেকে পাঠান। পরদিন সোমবার প্রথমে আমরা প্রভাতী শাখার প্রধান জিনাত আরার সঙ্গে দেখা করি। তিনি মেয়ের সামনে আমাদের বিভিন্নভাবে অপমান করেন। পরে তার কথামতো ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌসের কক্ষে যাই। মেয়ের কৃতকর্মের জন্য তার কাছে বাবা-মা হিসেবে ক্ষমা চাই।

কিন্তু নাজনীন ফেরদৌস রেগেমেগে আগুন। তার পায়ে পড়ি। কিন্তু নির্দয় এ মানুষটির কাছে আমাদের আবেগ অনুরোধ তুচ্ছ মনে হয়। কিন্তু অরিত্রীকে টিসি দিতে নির্দেশ দেন। আমরা শান্তিনগরের বাসায় ফিরে আসি। আমি চলে যাই পেশাগত কাজে। মেয়ে তার রুমে গিয়ে দরজা আটকে দেয়। এরপর গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে।

তিনি বলেন, চোখের সামনে বাবা-মাকে অপমান এবং নিজের শিক্ষাজীবনের শেষ, এ মানসিক যন্ত্রণা থেকেই শিশু হৃদয়ের অরিত্রী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। অরিত্রীর আত্মহত্যার বিষয়টি প্রকাশ পেতেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে তার সহপাঠীরা।

এদিকে এ ক্ষোভ থেকেই প্রকাশ পেতে থাকে ভিকারুননিসা স্কুল কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন অনিয়ম। বেরিয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে কীভাবে কোচিংবাণিজ্য হয়, ছাত্রত্ব বাতিল করে সেই কোঠা পূরণে কীভাবে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। বেরিয়ে পড়ে শিক্ষকদের চরিত্রের আসল রূপ। শিক্ষার্থীদের সাথে দুর্ব্যবহার ও ইভটিজিং এর মধ্যে বেশি আলোচিত। বিভিন্ন কারণে এতদিন অভিভাবকরা এসব প্রকাশে অনিহা প্রকাশ করলেও অরিত্রীর ঘটনার পর থেকে এ বিষয়ে মুখ খুলতে থাকেন ভুক্তভোগীরা।

এদিকে অরিত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় সকল বিবেকবান মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে বিচার দাবি করেছেন তারা। অন্যথায় এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না এমন নিশ্চয়তা দেয়া যায় না বলে তারা অভিমত ব্যক্ত করেন। অরিত্রী অমানবিক নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে উল্লেখ করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহিত কামাল আমার সংবাদকে বলেন, যেসব সামাজিক ক্ষত বা ঘটনা কাউকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে সেগুলো চিহ্নিত করে প্রতিরোধে জোরালো প্রচারণা চালাতে হবে। কারণ আত্মহত্যার পর তার পক্ষে কথা বলে কি লাভ?

তিনি বলেন, অরিত্রীর মতো শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টি উপলব্ধি না করে তার সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ করেছে শিক্ষকরা। তাকে সংশোধনের সুযোগ দেয়া উচিত ছিল।অমর্যাদাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে কাউকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া শিক্ষা ব্যবস্থারই দুর্বলতার দিক বলে মনে করেন আইন ও সালিসকেন্দ্রের (আসক) সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন।

তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতেই পারে। কিন্তু একজন শিশুকে আত্মহত্যায় বাধ্য করার মতো পরিস্থিতি যারা তৈরি করেন তাদের শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় এক মুহূর্তের জন্যও রাখা ঠিক হবে না।

মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান রিয়াজুল হক আমার সংবাদকে বলেন, শিশু আইন অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশ রয়েছে শারীরিক বা মানসিক কোনোভাবেই শিশুদের নির্যাতন করা যাবে না। তারপরও শিক্ষকরা এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করেই চলেছেন। যে কারণে অরিত্রীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না। এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক শিশু আইন ও আদালতের নিদের্শনা অনুযায়ী শিশুদের নির্যাতন বন্ধে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, তাতেও শিক্ষকদের টনক নড়েনি।

এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ আমার সংবাদকে বলেন, অরিত্রীর বিষয়টি দু:খজনক। আমি নিজেই গতকাল সেখানে গিয়েছি। তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি। জীবন নিয়ে খেলায় কে প্রকৃত দায়ী তাকে খুঁজে বের করে অবশ্যই আমরা সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবো। তাছাড়া বদলিসহ শাস্তি কার্যক্রমের সকল বিষয় দেখার দায়িত্ব ম্যানেজিং কমিটির।

আরোও পড়ুন...

HostGator Web Hosting