| |

সর্বশেষঃ

ভিকারুননিসায় নতুন অধ্যক্ষ : আমাদের শখের দাসত্ব!!

আপডেটঃ ৩:০৯ অপরাহ্ণ | ডিসেম্বর ০৯, ২০১৮

এহছান খান পাঠান
অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনার ঘটনায় বিক্ষোভের মুখে তিন শিক্ষককে বরখাস্ত করার পর ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ এবং প্রভাতী শাখার প্রধান পদে নতুন দুজনকে নিয়োগ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অরিত্রীর বাবার দায়ের করা মামলায় ভিকারুননিসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস ও প্রভাতী শাখার প্রধান জিনাত আখতার এবং শ্রেণি শিক্ষক হাসনা হেনার বিরুদ্ধে ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনার’ অভিযোগ আনা হয়। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তদন্তে অরিত্রীর আত্মহত্যায় প্ররোচনার জন্য ওই তিন শিক্ষককে চিহ্নিত করা হলে তিন শিক্ষককে বরখাস্ত, তাদের এমপিও বাতিল করা হয়। শ্রেণি শিক্ষক হাসনা হেনাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
শুনতে খারাপ শোনালেও সত্যি, অনেক আন্দোলনের মত ভিকারুন্নিসার আন্দোলন থেমে গেছে। কয়েকদনি পর এহেন এলিট স্কুলগুলোতে দলে দলে নিজেদের সন্তানদের ভর্তি করাতে আমরা ব্যস্ত হব। এভাবে নিজেদের প্রেস্টিজ বাড়াবো, বিনিময়ে স্কুলগুলোকে সুযোগ দেব আমাদের শোষণ করার।

আন্দোলন যদি করতে হয়, ঘর থেকে শুরু করেন। নিজে আয়নার সামনে গিয়ে নিজের গুরুত্ব বুঝুন। নিজেকে আমজনতা নামক চাকর ভাবা বন্ধ করুন আজ থেকে। নিজের সন্তানকে বলুন, নম্বর গুরুত্বপূর্ণ নয়, শিক্ষাটাই গুরুত্বপূর্ণ। যাতে সে নম্বরের জন্য এমন ঝুঁকি না নেয়। সন্তান আপনার আপন,স্কুল না। সন্তান স্কুলের বিপক্ষে কোন নালিশ করলে সেটা আমলে নিয়ে কারণ যাচাই করুন। মনে রাখবেন, যত এলিট স্কুলই হোক না কেন, যে স্কুল আপনার সন্তান কে শিক্ষার্জনের বদলে নম্বর আদায় শেখাবে, সেই স্কুল আদতে আপনার সন্তানকে অসততা শেখাচ্ছে।

আমরা নিজেদের ‘আমজনতা’ ভাবি। এবং আমজনতাই ভেবে চলি। এর চেয়ে বেশি কিছু ভাবার মানসিকতাটাই আমাদের নাই। সমস্যাটা সরাসরি আমাদের মনোভাবে। কড়া ভাষায় বললে আমাদের দাসসুলভ মনোভাবে। নিজেদের ‘আমজনতা’ বলে জেনারালাইজ করে করে আমরা এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে দিয়েছি যে- স্কুল, কলেজ, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এমনকি সরকার পর্যন্ত নিজেদের মনিব আর আমাদের দাস ভাবে। অথচ আমরা,এই আমজনতাই তাদের ক্ষমতার মূল চালিকা শক্তি। ধরেন পরের বছর থেকে কোন অভিভাবক ভিকারুননেসাতে তাদের মেয়েকে ভর্তি করালেন না। তাহলে কি হবে ভেবেছেন? নাহ। এমনটা ভাবা বা করে দেখানোর মত মনোবল আমাদের নাই,তাই আমরা আমজনতা। আমরা শুধু দোষ দেই আমাদের উপরে অত্যাচার করবার জন্য, আসলে সেই অত্যাচারীকে যে আমরাই মাথায় তুলি সেটা আমরা কেউ ভাবতে চাই না। ভাবিনা বলেই আমরা সংখ্যায় বেশি হয়েও ক্ষমতাহীন,গণ হয়েও আমরা গৌণ। আমরা নিজেদের নিয়ে শুধু ভাবি,”যেভাবে চলছে চলুক না,বেঁচে তো আছি।” ভেবে আমরা সব অন্যান্য অবিচারকেও এড়িয়ে চলি,আমাদের মধ্যে যারা প্রতিবাদ করে তাদের বেয়াদপ বলে চুপ করিয়ে যাই, সমাজের অনিয়ম যারা ভাংতে চায় উলটো তাদেরকেই সমাজচ্যুত করে সমাজপতির পা চাটি। এই জঘন্য দাসসুলভ মনোভাবের মধ্যেও আরেকটা ব্যাপার স্পষ্ট, সেটা হচ্ছে নিজেকে অন্য দাসদের তুলায় উৎকৃষ্ট দাস হিসাবে প্রমাণ করাটা, তা যেভাবেই হোক।

এমন বলছিনা যে আমাদের সব কাজে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে বিদ্রোহ করা উচিৎ। মান্য করা আর শ্রদ্ধা করা এর মধ্যে পার্থক্যটা খুজতে পারি না আমরা। সবসময় মান্য না করে প্রতিবাদ করার সামথ্য তৈরি করাও শিক্ষার অংশ। জ্ঞান থাকা জরুরি শোষণের চেয়ে শোষণ সহ্য করা গুরুতর অপরাধ।
ব্যাপারটা ছোটবেলা থেকে শুরু হয়। আমাদের শিখানো হয় গুরু জনকে সম্মান করবে, আমরা করি। করতে করতে স্কুলের শিক্ষক,স্কুলের প্রধান শিক্ষক,কলেজের শিক্ষক,কলেজের অধ্যক্ষ,বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক,চাকুরিক্ষেত্রে বস, এরপরে সন্তান হলে তাদের স্কুলের শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক, তাদের কলেজের শিক্ষক ও অধ্যক্ষ, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক,তাদের অফিসের বস পর্যৗল্প আমাদের সম্মান করার পরিধি বাড়তে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের সম্মান করতে গিয়ে যাদের আসলে যাদের সম্মান করা দরকার , সেই বাবা-মা দেও সম্মানের দিকে তাকাই না। আমাদের সম্মান করা আর আমাদের দিয়ে সম্মান করানো মানুষের সংখ্যা আর শেষ হয়না। এভাবে একদিন আমাদের ডাক পড়ে আর কবরে/চিতায় যাওয়ার সময় আমরা দেখি যে জীবনে খাওয়া,ঘুম আর হাগু-মুতুর পরে যে কাজটা সবচেয়ে বেশি করেছি সেটার নাম সম্মান।

নিজে বসকে তেল মেরে ভগবানের লেভেলে তুলে দিয়ে প্রমোশন আদায় করা, ছেলে মেয়েকে ‘ভালো’ স্কুলে ভর্তি করানোর পরে সেই স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাকে তেল মেরে ভগবানের লেভেলে তুলে দেয়া। এতে লাভ কি হয়? নিজেদের ‘প্রেস্টিজ’ বাড়ে। হ্যাঁ ‘প্রেস্টিজ’ বাড়ে। তবে কপালো দুর্ভোগ থাকলে সে সব ভগবানদের পায়ে পড়লেও কিন্তু রক্ষা হয় না।
”পাশের বাসার ছেলে/মেয়ে এলিট স্কুলের ছাত্র, ওদের পা ধোয়া পানি খেয়ে আয় দিনে দু’বার। ভাত খেতে হবেনা ওতেই চলবে” অথবা আমার মেয়ের জামাই বুয়েটিয়ান, আমার মেয়ের সাত জনমের ভাগ্য দুবেলা ভাত না খেয়ে বুয়েটিয়ান জামাই এর মার খাচ্ছে দু বেলা” অভিভাবকদের এমন ভাবনা থামাতে হবে।

আরেকটা বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যন্ত নকল করার সর্বোচ্চ শাস্তি পরীক্ষার হল থেকে চলমান পরীক্ষার জন্য বহিষ্কার করা। ছাত্রত্ব বাতিল নয়। সেখানে একটা স্কুল নিম্ন মাধ্যমিক বা মাধ্যমিক পর্যায়ে এত বড় শাস্তি কিভাবে দিতে পারে সেটাও একটা বড় প্রশ্ন। নীতির ব্যাপার আপোষ নয়, কথাটা তো বুঝলাম, কিন্তু নীতির ভেতরেই দূর্নীতি থাকলে সেই দূর-নীতি কে নিকট-নীতি বানানোর ব্যাপারে আমার অসুবিধা আছে।

এহছান খান পাঠান
বার্তা সম্পাদক, দৈনিক অর্থনীতির কাগজ

HostGator Web Hosting