| |

সর্বশেষঃ

আণবিক বোমা বিস্ফোরণের হারে উত্তপ্ত হচ্ছে সমুদ্র

আপডেটঃ ৩:২৬ অপরাহ্ণ | জানুয়ারি ০৯, ২০১৯

বিদেশ ডেস্ক : বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্বিজনিত কারণে গত দেড়শো বছরে সমুদ্র উত্তপ্ত হওয়ার বাৎসরিক হার সেকেন্ডে একটি আণবিক বোমা বিস্ফোরণের সমতুল্য। গবেষণা প্রতিবেদন বিশ্লেষণের পর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এমন দাবি করেছে। বিশ্লেষকরা বলেছেন, বর্তমানে সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধির হার আগের চেয়েও বেশি। এখন সমুদ্র যে হারে উষ্ণ হচ্ছে তা সেকেন্ডে তিন থেকে ছয়টি আণবিক বোমা বিস্ফোরণের সমান। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নেতৃত্বে নতুন গবেষণাটি করা হয়েছে। প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস সাময়িকীতে গত সপ্তাহে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। গবেষণায় সমুদ্রের সঞ্চালন সংক্রান্ত কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে ১৮৭১ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সমুদ্রের পৃষ্ঠভাগের তাপমাত্রার পরিমাপগুলোকে সমন্বিত করা হয়েছে।

সাগরের অভ্যন্তরীণ তথ্য সংগ্রহে আরগো ফ্লোট রোবট মোতায়েন

গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মানুষ কর্তৃক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত করার মধ্য দিয়ে যতটুকু যে পরিমাণ উষ্ণতা তৈরি হয় তার ৯০ শতাংশেরও বেশি সমুদ্রগুলো শুষে নেয়। আর বাকি সামান্য উষ্ণতা বাতাস, ভূমি ও মেরু অঞ্চলের বরফ খণ্ডকে উষ্ণ করে। যে বিপুল পরিমাণ এনার্জি সমুদ্রে যুক্ত হচ্ছে তা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে আরও শক্তিশালী রূপে হাজির হচ্ছে হারিকেন ও টাইফুন।

বেশিরভাগ উষ্ণতা সমুদ্রের গভীরে সংরক্ষিত রয়েছে। তবে এর পরিমাণ নির্ধারণের কাজ শুরু হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। এতোদিন সাগরের মোট উষ্ণতা নির্ণয়জনিত যে গবেষণাগুলো করা হয়েছে সেগুলো ১৯৫০ সালের আগের হিসাব নয়। তবে নতুন গবেষণার জন্য সময়সীমা বিস্তৃত করে ১৮৭১ সাল করা হয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, অতীতে সমুদ্রের উষ্ণতার পরিবর্তনজনিত বোঝাপড়া দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ভবিষ্যত প্রভাব নিরুপণ করা কঠিন।

গার্ডিয়ানের হিসাব অনুযায়ী, ১৫০ বছরের ওই সময়সীমার মধ্যে সমুদ্র গড়ে যতোখানি উষ্ণ হয়েছে তা সেকেন্ডে প্রায় দেড়টি হিরোশিমা আকারের আণবিক বোমা বিস্ফোরণের সমান। তবে কার্বন নির্গত হওয়ার হার বেড়ে যাওয়ার কারণে সমুদ্র উষ্ণ হওয়ার হারও বেড়েছে। এখন তা বেড়ে এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, যাকে সেকেন্ডে তিন থেকে ছয়টি আণবিক বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৫০ বছরে সমুদ্র যত উষ্ণ হয়েছে তা পুরো বৈশ্বিক জনগোষ্ঠী ব্যবহৃত বার্ষিক জ্বালানির পরিমাণ থেকে ১০০০ গুণ বেশি।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাওরে জান্না নতুন গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। গার্ডিয়ানকে তিনি বলেন, ‘সাধারণত এ ধরনের হিসাব-নিকাশ না করার চেষ্টা করি আমি। কারণ একে আমার কাছে উদ্বেগ সৃষ্টিকারী বলে মনে হয়। আমরা সাধারণত একে কম ভীতিকর করে দেখানোর জন্য উষ্ণতার মাত্রাকে মনুষ্যসৃষ্ট এনার্জি ব্যবহারের সঙ্গে তুলনা করে থাকি।’

তিনি আরও বলেন, ‘অবশ্যই আমরা জলবায়ু ব্যবস্থার মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত জ্বালানি ছাড়ছি এবং নিঃসন্দেহে এর অনেকখানিই সাগরে মিশে যাচ্ছে।’

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি হলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দীর্ঘমেয়াদী বিপজ্জনক প্রভাবগুলোর একটি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি উপকূলীয় শহরগুলোতে বসবাসরত কোটি কোটি মানুষের জন্য হুমকি তৈরি করে। এ ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সম্ভাব্যতা নিরূপণ করা জরুরি। গ্রিনল্যান্ডে থাকা বরফ গলার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার আরেকটি বড় কারণ হলো, উষ্ণতাজনিত কারণে পানির ভৌত বিস্তার।

স্রৌতের মাধ্যমে বিশ্বের এক সমুদ্র থেকে অন্য সমুদ্রে উষ্ণতা পৌঁছে গেলেও সমুদ্রগুলো সমভাবে উষ্ণ হয় না। গত ১৫০ বছর সমুদ্রগুলো যে পরিমাণ উষ্ণতা শুষে নিয়েছে তার ভিত্তিতে এ ধারণা করা যায়। উদাহরণস্বরূপ আটলান্টিক মহাসাগরের কথা বলা যায়। সমুদ্র স্রোতের স্থানান্তরিত উষ্ণতার কারণে ১৯৭১ সাল থেকে নিম্ন ও মধ্য অক্ষাংশে অর্ধেক উষ্ণ হয়েছে আটলান্টিক।

পরিবেশ বিজ্ঞানী ডানা নুচ্চিটেলি বলেন, ‘বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্র উষ্ণ হওয়ার হার বেড়েছে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে সমুদ্র উষ্ণ হওয়ার মাত্রা বেড়ে সেকেন্ডে তিন থেকে ছয়টি হিরোশিমা বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। গবেষণায় কোন সময়সীমা ও কোন পরিসংখ্যান ব্যবহার করা হচ্ছে তার উপর নির্ভর করছে মাত্রার তারতম্য। নতুন এ গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সমুদ্র উষ্ণ হওয়ার হার প্রতি সেকেন্ডে তিনটি হিরোশিমা বোমা বিস্ফোরণের সমান। অন্যান্য পরিসংখ্যানের চেয়ে এটি সবচেয়ে কম মাত্রার।’

আশা করা হচ্ছে, নতুন এ কাজটি গবেষকদের ভবিষ্যতে বিভিন্ন অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো পূর্বাভাস দিতে সহায়তা করবে। গবেষকরা মনে করছেন, ‘স্রোতের মাধ্যমে সমুদ্রের উষ্ণতা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের মাত্রা বৃদ্ধিতে গুরুতর প্রভাব ফেরতে পারে। এতে উপকূলীয় বন্যার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। গবেষকরা আরও মনে করেন, বৈশ্বিক ও আঞ্চলিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে পূর্বাভাস দিতে হলে সমুদ্রের উষ্ণতা পরিবর্তনের বিষয়টি বুঝতে হবে। উষ্ণতার ধরন নির্ধারণে সমুদ্রের গতিবিধির ভূমিকেও বুঝতে হবে।

আরোও পড়ুন...

HostGator Web Hosting