| |

সর্বশেষঃ

শেষ হলো মাসব্যাপী বাণিজ্যমেলা ২শ কোটি টাকার রপ্তানি অর্ডার

আপডেটঃ ৩:৫২ অপরাহ্ণ | ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে আয়োজিত মাসব্যাপী বাণিজ্যমেলা ২০০ কোটি টাকা রপ্তানি অর্ডারের মধ্য দিয়ে গতকাল শেষ হয়েছে। গত ৯ জানুয়ারি শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার আয়োজন করে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। ইপিবির উপ-পরিচালক (ফাইন্যান্স) ও মেলার সদস্য সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা সার্থক হয়েছে। পুরো মেলাজুড়েই দর্শনার্থীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে ছুটির দিন এলেই উপচেপড়া ভিড় হতো বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। মেলার শেষের দিকে সবচেয়ে বেশি জমেছে মেলা। বেচাকেনা শেষেই বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। আনন্দ-উৎসবের মেলা সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হলেও অনুষ্ঠান শেষে অনেকের মুখে ছিল অন্ধকারের ছাপ। ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা পূর্বাচলে আয়োজন করা সম্ভব নয় বলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ঘোষণা দেয়ার ফলেই হয়তো বা এমন হয়েছে বলে অনেকে ভাবছেন। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পশ্চিম পাশের মাঠ থেকে বাণিজ্যমেলা সরিয়ে নেয়ার জন্য ২০১৫ সালে ‘বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিভিশন সেন্টার কমপ্লেক্স’ (বিসিএফইসি) নামের চীনের সহায়তায় ৭৯৬ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। এ প্রকল্প নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ব্রাহ্মণখালীর বাগরাইয়াটেকের (পূর্বাচল) ২০ একর জায়গার ওপর বাস্তবায়ন হচ্ছে। বাস্তবায়ন চুক্তি অনুযায়ী, চীন সরকার নির্মাণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘চাইনিজ স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন’ নামের প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি ২০২০ সালের মধ্যে শেষ হবে। এরই মধ্যে এমন ঘোষণায় অনেকের মুখে অন্ধকারের ছায়া নেমে এসেছে। শত কোটি টাকার প্রকল্প শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে সম্প্রতি দায়িত্ব নেয়া বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলছেন, বাণিজ্যমেলা পূর্বাচলে হবে না। এই প্রকল্পটি নেয়া হয় সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের সময়। গতকালের বাণিজ্যমেলার সমাপনী অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি তোফায়েল আহমেদ। সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এ বিষয়ে বলেন, ‘এই জায়গা অপ্রতুল আমাদের জন্য। অনেকের ধারণা, আমরা পূর্বাচলের দিকে যেটা করছি, সেটা এ রকম বাণিজ্যমেলা হবে কি না। সেটা সম্ভবত হবে না। এখানে ৩৬ একরের ওপরে আমাদের জায়গা, তারপরও সঙ্কুলান হয় না। ওখানে জায়গা আরও কম। সম্ভবত ওখানে যারা চিন্তা করেছিলেন আমাদের পূর্বসূরি বা এখনো, ওখানে সারা বছর ধরেই বিভিন্ন এক্সপোর্ট, মেলা বা শো, বিভিন্ন অর্গানে ফুড প্রোডাকশন নিয়ে আসবে। বিদেশিরাও আসতে পারে। এসে আমাদের এখানে ওই ধরনের এক্সপোর্ট ফেয়ার করতে পারবে। এ ধরনের বাণিজ্যমেলা ওখানে করা যাবে না। টিপু মুনশি আরও বলেন, আমার মনে হয়েছে, এখনই এই জায়গা অপ্রতুল। তাহলে ১০ থেকে ২০ বছর পরে কোথায় হবে বাণিজ্যমেলা। সেটাও কিন্তু এখনই চিন্তা করার সময় এসেছে। আমাদের সরকারি কর্মকর্তারা রয়েছেন, আপনারা কিন্তু এই ব্যাপারটা দেখবেন। আমি জানতে চেষ্টা করব, কী করা যায় সামনের দিনগুলোতে। এদিকে এ মেলায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিদেশের প্রায় ২০০ কোটি টাকার রপ্তানি অর্ডার পেয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। এ ছাড়া মেলায় মানুষের উপস্থিতি অর্ধ কোটি পার হয়েছে বলে জানান তিনি। এবারের বাণিজ্যমেলায় প্যাভিলিয়ন, মিনি-প্যাভিলিয়ন, রেস্তোরাঁ ও স্টলের মোট সংখ্যা ছিল ৬০৫টি। এর মধ্যে প্যাভিলিয়ন ১১০টি, মিনি-প্যাভিলিয়ন ৮৩টি ও রেস্তোরাঁসহ অন্যান্য স্টল ছিল ৪১২টি। এবার বাংলাদেশ ছাড়াও ২৫টি দেশের ৫২টি প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নেয়। দেশগুলো হলো থাইল্যান্ড, ইরান, তুরস্ক, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল, চীন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান, হংকং, সিঙ্গাপুর, মরিশাস, দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান। অন্যদিকে মেলায় ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করা হয়। এ ছাড়াও এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে সর্বোচ্চ ভ্যাট প্রদান করায় তিনটি প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি স্মারক দেয়া হয়। বাণিজ্যমেলায় সর্বোচ্চ ভ্যাট প্রদান করে প্রথম হয়েছে হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড, দ্বিতীয় ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং তৃতীয় হয়েছে এসকোয়ার ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড। বাণিজ্যমেলায় অনন্য সম্মাননা পুরস্কার পেয়েছে কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড। সেরা প্রিমিয়ার প্যাভিলিয়ন ও সেরা সাধারণ প্যাভিলিয়নে প্রথম হয়েছে ওয়াল্টন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। সেরা সংরক্ষিত প্যাভিলিয়নে প্রথম হয়েছে জুট ডাভার্সিফিকেশন প্রোমোশন সেন্টার (জেডিপিসি)।
সেরা বিদেশি প্যাভিলিয়নে প্রথম হয়েছে যৌথভাবে হাডেক্স হালি ডেরি টেক্সটাইল ডাইস টিআইসি এ এস তুর্কি এবং জাপান হালাল কোম্পানি লিমিটেড। সেরা প্রিমিয়ার মিনি প্যাভিলিয়নে বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সেরা সাধারণ মিনি প্যাভিলিয়নে বঙ্গ মিলার্স লিমিটেড, সেরা সংরক্ষিত মিনি প্যাভিলিয়নে বাংলাদেশ পোস্ট অফিস, সেরা প্রিমিয়ার স্টলে এম এস হেলাল ও ব্রাদার্স এবং সেরা সাধারণ স্টলে প্রথম হয়েছে ফরচুন টেক লিমিটেড। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সেরাদের গোল্ড কালার্ড ট্রফি দেয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে দ্বিতীয়, তৃতীয় স্থান অধিকারীদের মাঝে সিলভার ট্রফি ও ব্রাস ট্রফি দেয়া হয়। আর নারী উদ্যোক্তা বিভাগে সিলভার ট্রফি পেয়েছে গৃহিণী ফুড প্রোডাক্টস ও মা এন্টারপ্রাইজ। খুশির সংবাদের পাশাপাশি দুঃসবাদও কম নয়। ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় এক মাসে ৫১ প্রতিষ্ঠানকে চার লাখ ৪৭ হাজার টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। গতকাল পর্যন্ত বাণিজ্যমেলায় অবস্থিত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের স্টল থেকে এ তথ্য জানা যায়। ভোক্তা অধিদপ্তরের ঢাকা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক শাহনাজ সুলতানা জানান, মাসব্যাপী বাণিজ্যমেলায় অভিযান চালিয়ে ৪১টি প্রতিষ্ঠানকে দুই লাখ ৯৯ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অন্যদিকে ভোক্তা অধিকারের স্টলে এসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৩৮টি অভিযোগ এসেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ১০টি প্রতিষ্ঠানকে এক লাখ ৪৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বাকি অভিযোগগুলোর মধ্যে কিছু সমঝোতা হয়েছে, কিছু অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। আর জরিমানা করার টাকার ২৫ শতাংশ, অর্থাৎ ৩৭ হাজার টাকা অভিযোগকারীদের ফেরত দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও মেলাকে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে ২০১৫ সালে চীনের সহায়তায় ৭৯৬ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। তবে এখনই তা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হচ্ছে না। আরও অন্তত আট থেকে ১০ বছর সময় লাগবে কিংবা লাগতে পারে ২০ বছরও! এতে খরচও বাড়বে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম দিকে মেলায় হকারদের উৎপাত না থাকলেও শেস সপ্তাতে তা তাদের ভুগিয়েছে। এসব হকারদেরকে ফটকে থাকা দায়িত্বশীলরাই টাকার বিনিময়ে প্রবেশ করতে দিয়েছে বলে তাদের ধারণা। উল্লেখ্য, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১৯৯৫ সাল থেকে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার আয়োজন করে আসছে। এটি ছিল ২৪তম বাণিজ্যমেলা।

আরোও পড়ুন...

HostGator Web Hosting