| |

সর্বশেষঃ

কারও সঙ্গে যুদ্ধ করব না, তবে প্রস্তুতি থাকতে হবে : প্রধানমন্ত্রী

আপডেটঃ ৭:০৬ অপরাহ্ণ | এপ্রিল ০৪, ২০১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে সংশ্লিষ্ট সকলকে এই ব্যাপারে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের আহবান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা আলোচনা করেছি, চুক্তি সম্পাদন করেছি এবং তাদের (মিয়ানমার) সঙ্গে আলাপ- আলোচনার মাধ্যমে এদেরকে (রোহিঙ্গা) নিজ দেশে ফরত পাঠানোটাই আমাদের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য নিয়ে আমরা এখনও কাজ করে যাচ্ছি। মিয়ানমারের সাথে আমরা ঝগড়া বাঁধাতে যাইনি।’
শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে এসে উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে একথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্বে রয়েছেন।
গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠ্যতা অর্জনের পর চতুর্থবারের মত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের অংশ হিসেবে এদিন প্রথম বারের মত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে আসেন তিনি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ এই নীতিতেই তার সরকার বিশ্বাসী এবং সেই নীতিতেই সরকার পরিচালিত হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি এটাই বলবো মিয়ানমার যেহেতু আমাদের প্রতিবেশী। আমরা কখনও তাঁদের সঙ্গে সংঘাতে যাব না।’
‘বরং তাঁদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে তাঁদের নাগরিকদের তারা যেন ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই প্রচেষ্টাই আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। সে বিষয়ে সবাই যেন সেভাবেই দায়িত্ব পালন করেন, সেজন্যও আমি অনুরোধ করবো,’ যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রাকৃতিক বা মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগ, যাই হোক না কেন তাকে মোকাবেলা করার ক্ষমতা বাংলাদেশ রাখে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়াটাও আজকে বিশ্বের অনেকের কাছেই বিস্ময়।’
কেবল মানবিক কারণেই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা মানবিক কারণেই এটা করেছি। নিজেদেরও বলতে গেলে রিফিউজি হিসেবে ’৭৫ এর পরে ৬ বছর বিদেশে অবস্থান করতে হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, নিজের নামটাও আমরা ব্যবহার করতে পারিনি। এরকম দিনও আমাদের মোকাবেলা করতে হয়েছে।’
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের শরণার্থীরা ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের নিজেদেরই অভিজ্ঞতা রয়েছে যে, ১৯৭১ সালে আমাদের ১ কোটি মানুষ শরণার্থী হিসেবে ছিল। তাদেরকে নিয়ে এসে পুনর্বাসন করতে হয়েছে, সেই অভিজ্ঞটাও রয়েছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা কারো সাথে যুদ্ধ করবো না, আমরা যুদ্ধ করতে চাইনা, সবার সঙ্গে একটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চাই।’
সেনাবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. শামসুল হক, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরী, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আবুল কালাম আজাদ এসময় উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান, প্রতিরক্ষা সচিব আখতার হোসেন ভূইয়াঁ, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন, প্রেস সচিব ইহসানুল করিম এবং পদস্থ সামরিক কর্মকর্তাবৃন্দও অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৭৫ এ জাতির পিতাকে হত্যার পর এদেশ সমগ্র বিশ্বে তাঁর মর্যাদা হারিয়েছিল। আর ২১ বছর পর ’৯৬ সালে আমাদের সরকার গঠনের পর তাঁর সরকারের লক্ষ্যই ছিল এই হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করা।
প্রধানমন্ত্রী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে এসে স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘এই জায়গাটা আমাদের অনেক স্মৃতি বিজড়িত জায়গা।
তিনি বলেন, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে এখানেই অফিস করেছেন। তখন এটাই ছিল তাঁর অফিস। আর আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হিসেবে যেটা ব্যবহার করছি সেটা ছিল পার্লামেন্ট হাউজ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রতীক হচ্ছে তাঁর প্রতিরক্ষা। একটা দেশকে কিভাবে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করা যায়, আবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়গুলোও এখান থেকেই কার্যকর করা হয়। আমাদের দেশের আবহাওয়া জলবায়ু থেকে শুরু করে অনেক কাজই হয় এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই সরকার গঠনের পর সবসময় এই মন্ত্রণালয়টি তিনি নিজের কাছেই রাখেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর ফলে, আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতীক সশস্ত্র বাহিনীকে যেমন আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা যাচ্ছে, তেমনি ভৌগলিক অবস্থানের কারণে জলবায়ুর প্রভাব নিয়ে কাজ করারও একটা সুযোগ আমাদের রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী এসময় ভারত এবং মিয়ানমারের সঙ্গে স্থল সীমানা চুক্তি এবং সমুদ্র সমস্যা সমাধানে তাঁর সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে বলেন, জাতির পিতাই এর শুরুটা করে যান। কিন্তু কেন যে পরবর্তী সরকারগুলো সেটা বাস্তবায়ন করেনি সেটা বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, সে সময় ১৯৭৪ সালেই জাতির পিতা ভারতের সঙ্গে ‘স্থল সীমানা চুক্তি’ করে সংসদে আইন পাশ করে সংবিধান সংশোধন করে তা সন্নিবেশিত করে যান। আর বঙ্গবন্ধু সেই ’৭৪ সালেই সমুদ্র সীমানা আইন করে যান, যেখানে জাতিসংঘও এই আইন করেছে ১৯৮২ সালে। কাজেই পৃথিবীর বহু দেশ পরবর্তীতে সমুদ্র সীমা নিয়ে কোন বিরোধ নিষ্পত্তির দরকার হলে আমাদের আইনটাকেই তারা ব্যবহার করতো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতের সংবিধানে যেহেতু স্থল সীমানা আইনটি পাশ হয়নি তাই স্বাভাবিকভাবেই সেটা আর তখন কার্যকর হয়নি এবং আমাদের কোন সরকারও ভারতের কাছে বিষয়টি তোলেনি। তবে, ’৯৬ সালে সরকারে আসার পরই এই বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করে সেটি তাঁর সরকার বাস্তবায়ন করে, বলেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা শান্তি চাই, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চাই কিন্তু কেউ যদি আমাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে তার যথাযথ জবাব যেন আমরা দিতে পারি এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যেন রক্ষা করতে পারি সে প্রস্তুতিটা সবসময় আমাদের থাকতে হবে।
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের জন্য নয়, শান্তির জন্যও আমাদের প্রস্তুতি দরকার। আর সেখানেও অবশ্যই আমরা একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে যাতে চলতে পারি সে ব্যবস্থাটাও আমাদের থাকা উচিত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এরসঙ্গে আরেকটি বিষয় হলো এখন শান্তি রক্ষার জন্য আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা যাচ্ছে (শান্তিরক্ষা মিশনে), পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা যাচ্ছে। আমাদের যারা সেখানে যাবে আমি মনে করি, বিশ্ব পরিবর্তনশীল সেখানে প্রতিনিয়ত প্রযুক্তির পরিবর্তন হচ্ছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি এবং যুদ্ধের সরঞ্জাম থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রেই এবটি পরিবর্তন এবং আধুনিকায়ন হচ্ছে কাজেই আমাদের যারা সেখানে যাবে তাঁরা সববিষয়েই পারদর্শী হবে সেটাই আমরা চাই। কাজেই এটা একান্তভাবে দরকার।
তিনি যুগোপযোগী আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, সেভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, সে ধরণের সরঞ্জামাদি যোগার করা এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের গড়ে তোলা, কোথায় গিয়ে যেন আমাদের কাউকে কখনো ছোট মনে করতে না হয়, আমরা সেটাই চাই। এমনকি আমাদের পদবীর বিষয়ে আধুনিকায়ন করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রথমবারের পেন্টাগন সফরের উল্লেখ করে বলেন, এই অভিজ্ঞতার আলোকে দেশের সেনাবাহিনীর সকল পদকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করা হয়, তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, আমরা জাতিসংঘে যাচ্ছি কাজেই পরিচয়ের ক্ষেত্রে যেন সকলে সমান থাকতে পারি, যে যত ছোট বা বড় হোক না কেন। সেজন্য সমস্ত পদবিগুলোকে ঢেলে সাজানো হলো। মন্ত্রণালয়গুলিও যেন আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর হয় সে পদক্ষেপটাও আমরা নিয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী এসময় ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র মুক্ত করে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত সমৃদ্ধশালী করে গড়ে তুলতে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।
পরে প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার স্মৃতি রক্ষার্থে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্থাপিত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি কিছুটা আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি সেখনে রক্ষিত পরিদর্শন বইয়েও স্বাক্ষর করেন।

HostGator Web Hosting