| |

সর্বশেষঃ

ময়মনসিংহে ১০৩ টাকায় পুলিশে চাকরী

বর্গাচাষী কলা বিক্রেতা রিক্সা চালক শ্রমিক গামেন্টকর্মী ও চা বিক্রেতার মত পরিবারের সদস্য সিংহভাগ

আপডেটঃ ১১:৪০ অপরাহ্ণ | জুলাই ১০, ২০১৯


মোঃ রাসেল হোসেন, ময়মনসিংহ প্রতিদিন ডটকম : ময়মনসিংহে পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি প্রাপ্তদের বেশিরভাগই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। অনেকের বাবা নেই আবার কারো মা নেই। জীবনের সঙ্গে লড়াই সংগ্রাম করে খেয়ে না খেয়ে আবার কখনো আধাপেট খেয়ে কোন রকমে পড়াশুনার খরচ চালিয়ে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করেছে। এভাবে টেনে হেছড়ে লেখাপড়া চালিয়ে আবার সরকারী চাকরী তা কোন দিন ভাবেনি। সরকারী চাকরী তো সোনার হরিণ। বিনা পয়সায় সরকারী চাকরি সোনার হরিণ হাতে পেয়ে বর্গাচাষী, দিনমজুর, কলা বিক্রেতা, চা বিক্রেতা, রিক্সা চালক, কাঠ মিস্ত্রী, রং মিস্ত্রী, সবজি বিক্রেতা, তাত শ্রমিক, গামেন্টকর্মী, মুদি দোকানী, গাড়ীল হেলপাড়, স্কুলের দপ্তরীর সন্তানদের অনেকের চোখেই ছিল আনন্দাশ্রু।


প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ২৫৭ নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে কৃষকের ছেলে ৭৬জন, নিজের সামান্য এবং পরের জমি মিলিয়ে কৃষিকাজ করে এমন পরিবারের সন্তান ১৮জন, অন্যের জমি বর্গাচাষ করে এমন পরিবারের সন্তান ৩০, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সন্তান ১০, দিন মজুরের সন্তান ৩ জন, অবসরপ্রাপ্ত সরকারী চাকুরীজিবীর সন্তান ৪, কর্মরত পুলিশ সদস্যের সন্তান ১৭, শিক্ষকের সন্তান ৪, বাবুর্চির সন্তান ২, গ্রাম পুলিশের সন্তান ১, অটো চালকের সন্তান ২, একমাত্র মুক্তিযোদ্ধার ভাতার উপর নির্ভরশীল পরিবারের সন্তান ১২, চা বিক্রেতার সন্তান ১, কাঠ মিস্ত্রীর সন্তান ৩, কলা বিক্রেতার সন্তান ১, রিক্সা চালকের সন্তান ৪, সবজি বিক্রেতার সন্তান ৫, রং মিস্ত্রীর সন্তান ১, গামেন্টর্সকর্মী ৫, তাত শ্রমিক ১, সরকারী চাকুরীজিবীর সন্তান ৬, বেসরকারী চাকরীজিবীর সন্তান ৮, প্রবাসীর সন্তান ৫, পল্লী চিকিৎসকের সন্তান ৩, মুদি দোকানদার ৫, স্কুলের দপ্তরীর সন্তান ২, গাড়ীর হেলপাড় ১, সেলুেেনর কাজ করে এমন পরিবারের সন্তান ১, প্রার্থী নিজে টিউশনি করে পরিআর চালায় এমন সন্তান ১, প্রার্থী নিজে গার্মেন্টকর্মী ১জন। অপরদিকে কৃষি, বর্গাচাষী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিন মজুর, অবঃ পুলিশ সদস্য, কর্মরত পুলিশ সদস্য, শিক্ষক, কাঠ মিস্ত্রিী ও ফল বিক্রেতা পরিবারের সদস্যদের মধ্য থেকে আরো ৪৫জনকে অক্ষেপমান তালিকায় রাখা হয়েছে বলে পুলিশ সুত্র জানায়।

এদিকে মাসুদের স্বপ্ন ছিল পুলিশে চাকরি করার। স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার যোজন যোজন ব্যবধানে আশাহত হয়েছিলেন। হঠাৎ একদিন জানতে পারলেন পুলিশে চাকরি পেতে কোনো টাকা-পয়সা লাগেনা। আবেদন ফরম পূরণ করে গত ১ জুলাই ময়মনসিংহ পুলিশ লাইনে দাঁড়ালেন শফিকুল ইসলামের ছেলে মাসুদ।


সব বাছাইয়ে মেধা ও যোগ্যতায় উত্তীর্ণ হলেন। সোমবার রাত ৮ টায় ময়মনসিংহ পুলিশ লাইন্সে ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল(টিআরসি) পদে চুড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পর আনন্দে কেঁদে ফেললেন তরুণ মাসুদ। এ তো আনন্দের অশ্রুজল।
শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে খুশির দিন আজ। বিনা পয়সায় আমার ছেলের চাকরি হয়েছে। টাকা ছাড়া চাকরী হয় এটা তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। তিনি বলেন, আমি কোন দিন কল্পনাও করিনি যে টাকা ছাড়া আমার ছেলের চাকরী হবে। ছেলে মাসুদ কোন দিন সরকারী চাকরী করবে এটা ভাবিনি। যা এত আমার বিশ্বাসই হতো না। মাসুদের পিতা শফিকুল ইসলাম বলেন, আমি ময়মনসিংহ শহরের ছোট বাজারে সামান্য পয়সায় বই খাতা বাধানোর কাজ করে কোনভাবে টেনে হিছড়ে সংসার চালাই। আমার এক ছেলে তিন মেয়ে। এক মেয়ে বিয়ে দিয়েছি।

অন্য দুই মেয়ে ও ছেলেকে নিয়ে টানাটনির সংসার। ছেলে মাসুদের কোন কিছু না হওয়ায় তিনি শহরেরই একটি কম্পেটারের দোকানে কাজ করতে দেন। অর্থের কারণে তাও প্রতিদিন আসা সম্ভব হয়নি। মাসুদের পিতা আরো জানান, তার বসতবাড়ির কোন জমি নেই। তিনি শ্বশুড়বাড়ি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চর নিলক্ষিয়ায় ঘর করে কোনভাবে বসবাস করছেন। এরই মাঝে বিনা পয়সায় পুলিশে চাকরী হওয়ায় তিনি সরকার ও পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞা প্রকাশ করেছেন।
মাত্র ১০৩ টাকায় পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি হয়েছে মাসুদের। নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন মাসুদ। কথা বলতে পারছিলেন না। আমি বাংলাদেশ পুলিশের গর্বিত সদস্য হতে পেরেছি। দেশের জন্য নিজের জীবন বাজি রাখবো। বিনা পয়সায় চাকরী পেয়ে এভাবেই তাদের অভিব্যক্তি ও অনুভুতি প্রকাশ করে বর্তমান সরকার ও ময়মনসিংহ পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।


সোমবার রাত ৮টায় ময়মনসিংহ পুলিশ লাইন্সে ফল ঘোষণার পর পুলিশ কনস্টেবল পদে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ এসব প্রার্থীরা এভাবেই সাংবাদিকদের সামনে নিজেদের অনুভূতির কথা জানান। চূড়ান্ত এ ফলাফল ঘোষণা করেন জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) শাহ আবিদ হোসেন। মাসুদের মত ময়মনসিংহে ২৫৭ জন মেধা ও যোগ্যতায় মাত্র ১০৩ টাকায় পুলিশে চাকরি পেয়েছেন।
পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন চুড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের আগে সংবাদ সম্মেলনে জানান, টিআরসি পদে ৬ হাজার ২৮০ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ২ হাজার ৩৬৮ জন লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করে ৪৫২ জন। এর মধ্যে থেকে ২৫৭ জন চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে।


পুলিশ সুপার জানান, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে এ পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ নজিরবিহীন ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আইজিপি ডঃ জাবেদ পাটোয়ারী শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীদের বাছাই করে এ নিয়োগ সম্পন্ন করার জন্য কড়া নির্দেশনা দিয়েছিলেন। আমরা পেশাদারিত্ব, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে এ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছি।’


দীর্ঘদিনের অভিযোগ, পুলিশ বিভাগে চাকরি পেতে হলে ঘুষ দিতে হয়। নইলে কোনো মুরব্বি বা টেলিফোনের জোর থাকতে হয়। নানা অভিযোগ, ঘুষ কেলেংকারী, যোগ্য ও মেধাবীদের বাদ দিয়ে অযোগ্য এবং দায়িত্ব জ্ঞানহীনদের পুলিশে নিয়োগ। এ নব অভিযোগের শেষ সীমায় পৌছেছিল পুলিশের ভাবমূর্তি। বর্তমান সরকার প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সময়ে এসে দেশ জুড়ে বাংলাদেশ পুলিশে নিয়োগ প্রক্রিয়া মাত্র শেষ হলো।


এত বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়োগের আগেই নানা অভিযোগ থেকে বেরিয়ে আসা এবং স্বচ্ছ একটি নিয়োগ পক্রিয়ার মাধ্যমে মেধাবী, যোগ্য, সৎ আদর্শবান যুবকদের নিয়োগ দিতে কঠোর নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা।
জনবান্ধব পুলিশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন পুরণে অঙ্গিকার পুরণ, দৃঢ়তা বাস্তবায়নে আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীর কঠোর নির্দেশনায় ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ কঠোর নিয়মানুবর্তীতা ও স্বচ্ছতার মধ্যে মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীদের চুড়ান্তভাবে বাছাই করে শতভাগ সফলতা লাভ করেছে।

HostGator Web Hosting