| |

সর্বশেষঃ

এসপি শাহ আবিদ হোসেনের কঠোর নির্দেশণায় জুয়ামুক্ত ময়মনসিংহ গড়তে পুলিশের ক্লান্তিহীন অভিযান

আপডেটঃ ২:৩৫ অপরাহ্ণ | অক্টোবর ০৮, ২০১৯

মোঃ রাসেল হোসনে, ময়মনসিংহ প্রতিদিন ডটকম : বহুকাল থেকেই জুয়ার জন্য আলোচিত এবং প্রসদ্ধি জেলা ময়মনসিংহ। এই জেলা সদরসহ এমন কোন উপজেলা, হাট-বাজার, গ্রামগঞ্জ নেই যেখানে জুয়া ছিল না। এই জুয়া নামক শব্দটির সাথে এ জেলার বিভিন্ন উপজেলা এমনকি গ্রামের মানুষগুলোর পরিচিত নেই তা বলা যাবেনা। অনেকের মুখে প্রচার আছে এ জেলা থেকেই সারা দেশে জুয়া নামক খেলাটি সারাদেশে প্রচার পায়। তাস, কড়ি, ছয়গুটি, তিনগুটি, পেট্টি, হাউজি, ওয়ানটেন, ওয়ানএইট সহ নানা নামে জুয়া চলে আসছে । বর্তমান পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন যোগদান করেই জুয়ার বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ায় বর্তমানে জেলায় জুয়া নেই বলেই চলে। যেখানেই জুয়া সেখানেই ডিবি পুলিশসহ থানা পুলিশ জুয়া বিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে। গ্রেফতার হচ্ছে জুয়ারীরা।
একাধিক মহল জানিয়েছে, ময়মনসিংহের স্টেডিয়ামে বছরের পর বছর ধরে চলত হাইজি। জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলা, থানা, ইউনিয়নসহ বড় বড় হাট-বাজার কেন্দ্রিক স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনীতিকদের সহায়তায় যাত্রা ও গানের নামে পেন্ডেল করে চলত জুয়া। তাস, কড়ি, পটগুটি (৬ গুটি, ৩ গুটি) পেট্টি, হাউজি, ওয়ান-টেন, ওয়ান-এইট, লটারী দিনব্যাপী মাইকিং করে চলত এ সব জুয়া। অনেকক্ষেত্রেই যাত্রাপালা ও পালার গানের দলগুলো এক জায়গা বা এক জায়গায় মাসখানেক অবস্থান করে অন্য উপজেলায় আবারো শুরু করতো জুয়া নামক যাত্রা ও গান। এছাড়াও অবিরাম বারোমাসি প্রতিটি উপজেলা, ইউনিয়ন, গ্রামগঞ্জ ও হ্টাবাজারে চলত তাস, কড়ি, ৬ গুটি, ৩ গুটির পট খেলা। বিভিন্ন হাট বাজার ও উপজেলা সদরের বাজারগুলোতে তাস, কড়ি, ৬ গুটি, ৩ গুটির পট খেলার জন্য পৃথক পৃথক ঘর তৈরী করে বছরব্যাপী দিবারাত্রি চলত জুয়ার আসর। শীত মৌসুমে নাটক, পালাগান, বাউলগান, যাত্রার নামে উলঙ্গ নৃত্য দেখানোর নামে প্রতিরাতে অসংখ্য গ্রামে মাইকিং করে চলত নানা ধরণের জুয়ার আসর। কথিত আছে গান নয় শীতের মৌসুমে গানের নামে জুয়ার মেলা। একটি চক্র ওয়ানটেন নামক জুয়া বছরের পর বছর ধারাবাহিক চালিয়ে কোটিপতি হয়েছেন বলেও প্রচার আছে। ঐ চক্রটি সারা বছর ময়মনসিংহ সদর, ত্রিশাল, ভালুকা, মুক্তাগাছা, ট্ঙ্গাাইলের সাগরদিঘি, বালুঘাট, রসুলপুর, মধুপুর, জামালপুরের বিভিন্নস্থানে পালাক্রমে ওয়ানটেন চালাত। ঐ ওয়ানটেন জুয়া খেলায় প্রতিরাতে ঢাকা, ট্ঙ্গাাইল, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোণা থেকে শত শত প্রাইভেটকার ও মাইক্রোযোগে অর্থবিত্ত ও প্রভাবশালীরা এসে রাতভর জুয়া খেলত। ওয়ানটেন জুয়ার আসরের ঐ আয়োজক চক্রটি বিভিন্নস্থান থেকে যানবাহনযোগে আসা জুয়ারীদের জুয়ার আসরের দিকে মনোযোগ আকর্ষণে যানবাহন ভাড়া, খাওয়া-দাওয়া, রাতযাপনের জন্য রেষ্টরুমের ব্যবস্থা করে রাখত। এছাড়া ঐ রেষ্টরুমে প্রভাবশালী জুয়ারীদের আপ্যায়ণ ও মনোরঞ্জনের জন্য সিগারেট, মদ, নারী সরবরাহ করা হতো।
এদিকে ময়মনসিংহ শহরের সার্কিট হাউজ মাঠ সংলগ্ন আবুল মুনসুর সড়কে ক্লাবের নামে যুগযুগ ধরে চলছে জুয়ার প্রতিযোগীতা। ক্লাবগুলোতে কোটি টাকার জুয়া খেলা চলার খবরে যেন প্রতিযোগীতা করেই ক্লাবগুলো জুয়ার আসর বসিয়ে ফায়দা লুটে নিচ্ছিল। স্টেডিয়ামে বছরের পর বছর জুড়ে চলত হাউজি। এ সব জুয়ার আসর থেকে প্রশাসনও নিত অর্থনৈতিক সুবিধা।
প্রশাসনের একাধিক দায়িত্বশীল ও স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকা এ সব জুয়ার ফলে ময়মনসিংহে প্রচার পেয়েছে জুয়ার উৎপত্তির জেলা ময়মনসিংহ। আইন শৃংখলা বাহিনী কতক লোকজন জুয়া থেকে লাখ লাখ টাকা ভাগবাটোয়ার পেতেন। এদিকে বুরজয়া সমাজ থেকে পরিচিতি ঘটে শিক্ষিত সমাজ হিসাবে। শিক্ষার প্রতিযোগীতা ঘটে গ্রামান্তার পর্যন্ত। ময়মনসিংহ জেলা বর্তমান বিভাগীয় নগরীসহ উপজেলাগুলোতে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। ময়মনসিংহকে মানুষ জানতে পারে শিক্ষার নগরী হিসাবে।
একাধিক মহলের মতে, আধিকাল থেকে চলে আসা জুয়ার জন্য প্রসিদ্ধ জেলা ময়মনসিংহের নাম পরিবর্তন করতে একাধিক দায়িত্বশীল আইন শৃংখলা বাহিনী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও শিক্ষিত সমাজ জুয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়তে থাকে। বন্ধ হতে শুরু হয় এ সব নানা নামের জুয়ার আসর। স্টেডিয়ামের জুয়াসহ মাইকিং করে গ্রামগঞ্জ, হাটবাজার, বিশাল মাঠ সাজিয়ে খোলা মাঠে গান ও যাত্রার নামে জুয়া বন্ধ করে প্রশাসন।
আইন শৃংখলা বাহিনীর একাধিক সুত্র মতে, বর্তমান পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন ময়মনসিংহে যোগদান করেই এ জেলার অতীত ইতিহাস জুয়ার জেলার পরিচিত এবং মাদকের ছয়লাভ জানতে পেরে এ সবের বিরুদ্ধে পুলিশের আভ্যন্তরীণ এক সভায় কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করেন। এ সময় পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন অধস্তন পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রতি হুশিয়ারী দিয়ে বলেন, জুয়া ও মাদকের সাথে কোন আপোষ নেই। জুয়া থেকে পুলিশ টাকা নিচ্ছে এ কালিমা পুলিশের শরীর থেকে দুর করতে হবে। জুয়ামুক্ত জেলা চাই। কোন কর্মকর্তা, ওসি, কিংবা কোন পুলিশ সদস্য জুয়া ও মাদকের সাথে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সুত্রে জানা গেছে, জুয়া ও মাদকের সাথে কোন নেতা বা প্রভাবশালী জড়িত থাকলে কিংবা মাদক ব্যবসায়ী ও জুয়াড়িদের ছাড়িয়ে নিতে তদবির করলে তাদের নামও জানানোর নির্দেশ দেন পুলিশ সুপার।
পুলিশ সুপারের কঠোরতায় ডিবি পুলিশসহ বিভিন্ন থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসারগণ জুয়া ও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ভুমিকা নিয়ে অভিযান শুরু করে। জুয়া বন্ধে পুলিশের কঠোরতায় একাধিক জুয়ার আসর থেকে জুয়ারি গ্রেফতারে বিভিন্ন থানা ও ডিবি পুলিশের অনেকটা প্রতিযোগীতা চলতে থাকে। এরই মাঝে তারাকান্দার গোপালপুরস্থ পলাশকান্দা গ্রামের অটোস্ট্যান্ড সংলগ্ন জনৈক নুরুজ্জামানের জমিতে জব্বার নামক ব্যক্তি ইট দিয়ে বিশাল ঘর তৈরী করে স্থায়ী জুয়ার আসর বসায়। খবর পেয়ে ডিবি পুলিশ ৩৮ জুয়ারীকে জুয়ার সরঞ্জাম ও বেশকিছু টাকাসহ তাদেরকে গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় ডিবি পুলিশ ৩৮ জুয়ারীর নামে মামলা করে আদালতে পাঠিয়েছে। সুত্রটির মতে, পলাশকান্দার ৩৮ জুয়ারী গ্রেফতারে জুয়ারীচক্র ক্ষিপ্ত হয়ে তারাকান্দার ওসি, ডিবি পুলিশ পরিদর্শক তদন্ত সহ ১০ পুলিশ সদস্যের নামে আদালতে মামলা করে। যদিও এ মামলাটি পরে আপোষ নিষ্পত্তি হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে যুগযুগ ধরে চলতে থাকা ময়মনসিংহ ক্রীড়া পল্লী হিসাবে পরিচিত সার্কিট হাউজ মাঠ সংলগ্ন আবুল মুনসুর সড়কের ক্লাবগুলোতে প্রতিযোগীতার সাথে চলতে থাকা জুয়ার আসরগুলোতে হানা দেয় আইন শৃংখলা বাহিনী। গুড়িয়ে দেয় এই ক্লাবের জুয়া। আটক করে জুয়ারীসহ অনেককেই। তাদেরকে আদালতে পাঠানো হয়। জুয়াহীন ক্লাবগুলো তাদের বিভিন্ন টিমের খরচ জোগানোর নাম করে আবারো জুয়া চালাতে তৎপর হয়ে আইন শৃংখলা বাহিনী ও প্রশাসনের বিভিন্নস্থানে ঘুরঘুর করছে বলে খবর রয়েছে। আইন শৃংখলা বাহিনী ও প্রশাসনের কঠোরতায় জুয়ারীচক্র হতাশ হয়ে পড়েছে।
পুলিশ সুত্রে জানা গেছে, ডিবি পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন থানা পুলিশ প্রায় প্রতিদিন জুয়ার আসরে হানা দিয়ে জুয়ারীদের গ্রেফতার করছে। ডিবি পুলিশের ওসি শাহ কামাল আকন্দ জানান, ময়মনসিংহ ডিবি পুলিশ জুয়া ও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। যেখানেই জুয়া সেখানেই ডিবির অভিযান এবং জুয়ারী ও মাদক ব্যবসায়দেরদের গ্রেফতার চলছে। কোথাও জুয়া চলছে এ ধরণের সংবাদ পেয়ে সময় ক্ষেপন না করে তাৎক্ষনিক অভিযান পরিচালনা করে যত প্রভাবশালীই হোক না কেন তাদেরকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হচ্ছে। তিনি বলেন, জুয়ামুক্ত ময়মনসিংহ গড়তে পুলিশ সুপারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে ডিবি পুলিশ ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করছে। গত এক বছরে অন্তত জুয়ার আসরে হানা দিয়ে প্রায় চার শতাধিক জুয়ারিকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠিয়েছে ডিবি পুলিশ। জুয়াবন্ধে এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জেলা পুলিশের কঠোরতায় আজ ময়মনসিংহ জেলায় জুয়া নেই বললেই চলে। তিনি জুয়ামুক্ত ময়মনসিংহ গড়তে সকলের সহযোগীতা চেয়েছেন।

HostGator Web Hosting