| |

Ad

সর্বশেষঃ

টোয়েন্টি২০ হচ্ছে না, আফসোসের হার বাংলাদেশের

আপডেটঃ ২:১৪ অপরাহ্ণ | নভেম্বর ১৬, ২০১৫

খেলাধূলা ডেস্ক : রবিবার রাতের প্রথম প্রহরের লগ্ন তখন সবে মাত্র শুরু। মিরপুর শের-ই-বাংলায় তখন বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ের ম্যাচের ক্লাইমেক্স শুরু। বাকি মাত্র ৮ বলের খেলা। জিম্বাবুয়ের জয়ের জন্য প্রয়োজন ১৯ রান। ১৯তম ওভারের চতুর্থ বল। ছুটছেন মুস্তাফিজ। ধামাকা শট। লুফে নিয়েছেন কিপার মুশফিক। আউট! মাদজিভাও সুবোধ বালকের মতো ফিরে যাচ্ছিলেন ড্রেসিংরুমে। হঠাৎ থামলেন, না থামানো হলো। আম্পায়ার বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানিয়েছেন ‘নো বল’। ব্যক্তিগত ১০ রানে ওই নতুন জীবন পেয়ে, ম্যাচে জিম্বাবুয়ের হয়ে বিজয় প্রদীপ জ্বালিয়েছেন মাদজিভা। ইনিংসের ২০তম ওভারের পঞ্চম বলে ছক্কা মেরে জিতিয়েছেন দলকে। অসাধারণ এক জয়। এমন জয় বিস্ময়ের চেয়েও বড় কিছু। ওই মাদজিভাই বাংলাদেশের উৎসবময় গ্যালারিতে এনে দিয়েছেন পিন-পতন নীরবতা। ব্যাট হাসিয়ে, নিজে লাফিয়ে ১৩৬ রানের টার্গেট এক বল বাকি থাকতেই ছুঁয়ে দেখেছেন। জিম্বাবুয়ে ৩ উইকেটের জয় তুলে নিয়ে টোয়েন্টি২০ সিরিজ সমতায় শেষ করেছে। ২০তম ওভারে যখন জয়ের জন্য ১৮ রান প্রয়োজন, নাসির প্রথম বলেই ওয়েলারকে ফিরিয়ে একটু থমকে যাওয়া গ্যালারিতে প্রাণের উত্তাপ ছড়িয়েছেন। তখন মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের জয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু সেই সব কল্পনাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে মাদজিভা বিস্ময় সৃষ্টি করেছেন। নাসিরের দ্বিতীয় বলটি পাঠিয়েছেন সোজা সীমানার বাইরে। পরের বলে ২। সমীকরণ তখন ৩ বলে ১০ রান। এবার দর্শনীয় বাউন্ডারি। শেষ ২ বলে প্রয়োজন ছিল ৬-এর। সেখানে এক বল হাতে রেখেই মাদজিভা জিম্বাবুয়েকে অসাধারণ এক জয় এনে দিয়েছেন। মাত্র ১৯ বলে ২৮ করা মাদজিভাই হয়েছেন ম্যাচের সেরা ক্রিকেটার। বল হাতেও ২ উইকেট তুলে নিয়েছিলেন এই নবীন জিম্বাবুইয়ান। জিম্বাবুয়ের অব্যাহত উইকেট পতনের পরও শঙ্কিত হননি ওয়েলার। প্রথম ম্যাচের মতো দ্বিতীয়টিতেও ওয়েলার তার প্রতিভাদীপ্ত ব্যাটিং কারিশমা দেখিয়েছেন। বলা যায় এই ব্যাটারই জিম্বাবুয়েকে খাদের কিনারা থেকে তুলে দিয়েছেন। ফিরিয়েছেন রানে, রচে দিয়েছেন বিজয়ের পথও। যদিও জয় পর্যন্ত উইকেটে থাকা হয়নি তার। তারপরও যা করেছেন তা বিস্ময় জাগানিয়া। তার পথেই হেঁটে জয় পেয়েছে জিম্বাবুয়ে।

জিম্বাবুয়ের টার্গেট ১৩৬ রানের। সেখানে আল-আমিনে দুর্দান্ত সূচনা বাংলাদেশের। ব্যক্তিগত প্রথম এবং দলীয় দ্বিতীয় ওভারেই পরপর ২ উইকেট নিয়েছেন এই পেসার। ৭ রানে ২ উইকেট হারিয়ে কিছুটা বিপদেই পড়েছিল সফরকারীরা। ১৫ এবং ৩৩ রানে জিম্বাবুয়ে হারিয়েছে আরও দুই উইকেট। সেখানে প্রথম নিয়েছেন মুস্তাফিজ। এবং পরেরটি রান আউট। ৩৯ রানে জিম্বাবুয়েকে ৫ উইকেট হারানো দল বানিয়েছেন আরাফাত সানি। এর পর সেই ওয়েলার। প্রথম টোয়েন্টি২০ ম্যাচের সেরা ব্যাটার দুর্দান্ত এক পার্টনারশিপ গড়েছেন জংউইর সঙ্গে। পাক্কা ৫৫ রানের। তাও মাত্র ৪১ বলে। জিম্বাবুয়ে জয়ের ঘোড়া তখন দারুণ ছুটছিল। সেখানে আবার আল-আমিনে ব্রেক থ্রু। দারুণ ক্যাচ। আল-আমিনের একটু টেনে দেওয়া বলে পুল করতে চেয়েছিলেন জংউই। ইমরুল চোখ ধাঁধানো এক ক্যাচে ফিরিয়েছেন ওই জংউইকে। স্কয়ার লেগে বেশ খানিকটা পেছনে দৌড়ে ক্যাচ নিয়েছেন ইমরুল। ওই আউটের মাধ্যমেই বাংলাদেশ নতুন প্রাণ স্পদন পেয়েছিল। দেখেছিল বিজয়ের পথও। কিন্তু ওয়েলার-মাদজিভা সেই জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন। হতাশার একরাশ মলিনতা নিয়েই সিরিজের শেষ ম্যাচে হার দেখে বাংলাদেশ। এক বল বাকি। এক বলে কতইবা হয়। ছক্কা। নো-ওয়াইড হলো আরও। ধরি ১০। যদি বাংলাদেশ ব্যাটিং ইনিংসে ১৫০ রান তুলতে পারত। সে কথা জিম্বাবুয়ের ওয়েলার প্রথম ম্যাচ শেষে বলেছিলেন, ‘১৫০-১৬০ স্কোর হলে ঘটনা উল্টো হতে পারত।’ রবিবার দ্বিতীয় টোয়েন্টি২০ ম্যাচের বাংলাদেশকে ১৩৫ রানে দেখে অনেকেই ১৫ রানের হাপিত্যেশ করেছিলেন। এনামুলের একটু ধীর লয়ের ব্যাটিংও হয়তো সে কারণে প্রশ্নবিদ্ধই হতে পারে। এনামুলের সাফাই হতে পারে-একাই ৪৭; অন্যরা…। এনামুলের হাফসেঞ্চুরি প্রলুব্ধ ব্যাটিংয়ের দায় কিন্তু অন্যদের নিতে হয়েছে। তারা উইকেটে এসে তেড়ে-ফুঁড়ে মেরেছেন। মারতে গিয়ে আউটও হয়েছেন। কারণ একপ্রান্ত আগলে রেখেছিলেন এনামুলই। সঙ্গে দারুণ ২টি ক্যাচ, রান আউট তো থাকছেই। কিন্তু ১২০ বলের ম্যাচে এভাবে ধীর লয়ের ব্যাটিংয়ে শেষ পর্যন্ত সর্বনাশ ডেকে এনেছে তার ব্যাটিং। এখনো টোয়েন্টি২০ ব্যাটিংটা হচ্ছে না বাংলাদেশের। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলপ্রসূ কিছুই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না দ্বিতীয় টোয়েন্টি২০ ম্যাচ শেষেও। প্রথম ব্যাটিং নিয়ে ধারাবাহিক উইকেট পতনে মধ্যে একা এনামুলই দাঁড়িয়েছিলেন। তাও ধীর-স্থির ব্যাটিংয়েই গুটিয়ে। ৪৭ রান করলেও তা টোয়েন্টি২০ ক্রিকেটীয় ধারায় পড়ে না। ৫১ বলে মাত্র ৪টি চারের মার, ছিল না কোনো ছক্কা তার ইনিংসে। এনামুলে ৪৭ রানের পর তামিমের ব্যাটে ২১। অবশ্য তামিমের ব্যাটে ধুন্ধুমারার ছিল। ১৫ বলে ২ ছক্কায় আর এক চারে ওই রানের সমীকরণ তাই। সাব্বিরের ব্যাটে তৃতীয় সর্বোচ্চ ১৮ বলে ১৭। সাকল্যে বাংলাদেশের রান ১৩৫। টোয়েন্টি২০ ম্যাচে যেখানে হরহামেশাই ২০০ প্লাস রান ওঠে। সেখানে ১৩৫ রান নিয়ে লড়াই করাটা বেজায় কঠিন। যদিও বাংলাদেশের বোলাররা প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন তা নিয়েই লড়াই করতে। বিশেষ করে আল-আমিন এবং মুস্তাফিজ। আল-আমিন ৩ উইকেট নিয়েছেন একাই ২০ রানে। কপাল পোড়া মুস্তাফিজ এক উইকেট নিলেও দিয়েছেন মাত্র ১২ রান। মন্দ যাননি আরাফাত সানি, ১/২৭। মাশরাফির ২৪ বলে ২৭ রানও মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু নাসিরই পড়ে গিয়েছেন বিপদে। মাশরাফি শেষ অপশন হিসেবেই তাকেই বেছে নিয়েছেন। তার আগের ৩ ওভারে ২৭ রান দেওয়ার পরও। কারণ গড় হিসেবে ৯ রান। তাই শেষ ওভারের ১৮ রানকে ঝক্কি-ঝামেলা মনে হয়নি। প্রথম বলেই উইকেট পেয়েছেন সবচেয়ে সফল ব্যাটার ওয়েলারের। কিন্তু পরের ৪ বলেই সব শেষ।

দেশে ফেরার আগে দারুণ জয়। জিম্বাবুয়ের কাছে এই জয় ছিল বলা যায় আরাধ্যসম। টানা ৪ ম্যাচে হেরে ৫ম ম্যাচে দুরন্ত এক জয় তাদের অনুপ্রাণিতই করবে। আর বাংলাদেশের কাছেও টোয়েন্টি২০ ম্যাচ এখনো গবেষণায় বিষয়বস্তু হিসেবেই রয়ে থাকল। আরও রপ্ত করতে হবে ছোট ভার্সনের ক্রিকেট। বিশেষত সামনে বিশ্বকাপের আরও নতুন কৌশলের অস্ত্র হাতুরুসিংহেই আবিষ্কার করতে হবে। এই ম্যাচে আর যাই হোক শেষ ওভারে অকেশনাল বোলার নাসিরকে বিপদে ফেলা ঠিক হয়নি। মাশরাফির কাছে এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা আশা করা যায়নি। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এই ২ ম্যাচে অনেক কিছুই শিখতে পারে বাংলাদেশ। বিশেষ করে চাপের মুখে ওয়েলারের ব্যাটিং, বোলার হয়েও মাদজিভার ব্যাটার হওয়ার পারদর্শিতা। দারুণ একটি বছর কাটিয়েছে এবার বাংলাদেশ। পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশের পর শক্তিশালী ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়েকে বছরের শেষ ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইওয়াশও করা হয়েছে। টোয়েন্টি২০ সিরিজের শুরুটাও হয়েছিল দুর্দান্ত এক জয়ে। কিন্তু বছরের শেষ ম্যাচে হারায় কষ্টটা বাংলাদেশকে তাড়িয়ে বেড়াবেই। কারণ নিশ্চিত জয় হাতছাড়া হলে আফসোসের রেশ মনোবলে চিড় ধরাতেই পারে।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

বাংলাদেশ : ১৩৫/৯, ২০ ওভার (এনামুল ৪৭, তামিম ২১, সাব্বির ১৭, ইমরুল ১০; পানিয়াঙ্গারা ৩/৩০, ক্রেমার ২/২১, মাদজিভা ২/২৫।)

জিম্বাবুয়ে : ১৩৬/৭, ১৯.৫ ওভার (ওয়েলার ৪০, জংউই ৩৪, মাদজিভা ২৮; আল-আমিন ৩/২০, মুস্তাফিজ ১/১২, আরাফাত সানি ১/২৬, নাসির ১/৪৫।)

ফল : জিম্বাবুয়ে ৩ উইকেটে জয়ী

সিরিজ : বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে ১-১ সমতা

(দ্য রিপোর্ট/এএস/জেডটি/এনআই/নভেম্বর ১৫, ২০১৫)

আরোও পড়ুন...