| |

সর্বশেষঃ

আমনেও ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে সংশয়

আপডেটঃ ৭:২৪ অপরাহ্ণ | নভেম্বর ১৩, ২০১৫

ঢাকা প্রতিনিধি : এবার বোরোতে অনেক জেলায় কৃষক ন্যায্যমূল্য পাননি, তাই ঘরে এখনো রয়ে গেছে বোরো ধান। একই সঙ্গে চলছে চাল আমদানি। বাজারে চালের দামের নিম্নগতি। তাই আমনে কৃষকের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়েও সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফসল আমন ধান কাটা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। গ্রামের ঘরে ঘরে উঠছে নতুন ধান, হবে নবান্ন উৎসব। রবিবার (১ অগ্রহায়ণ) রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলায় বসবে জাতীয় নবান্ন উৎসব। তবে কৃষক বঞ্চিত হলে তাৎপর্যহীন হবে নতুন ধানের নবান্ন।
কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারের পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেই। যা কিছুটা রয়েছে তাও বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আমনে সরকারের চাল সংগ্রহ কর্মসূচি কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করছেন তারা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা জানান, চলতি বছর ৫২ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে এক কোটি ৩০ লাখ ৯৭ হাজার টন ধান উৎপাদনের ল্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলন ভাল, আমন উৎপাদনে ল্যমাত্রা এবার ছাড়িয়ে যাবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বোরোতে মূল্য না পাওয়ায় অনেক কৃষক এবার ধান ধরে রেখেছেন। বাজারে এখন চালের দামও নিম্নমুখী। শুল্ক আরোপ করেও চাল আমদানি ঠেকানো যাচ্ছে না। এ অবস্থায় আমনে কৃষক ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে বলে মনে হচ্ছে না।
পটুয়াখালী জেলার দশমিনা উপজেলার মাছুয়াখালী গ্রামের কৃষক মো. বেলাল মৃধা বলেন, ‘এবারের ভাও (অবস্থা) ভাল দেখতেয়াছি না। বাজারে চাউলের দাম কম। আমাগো এদিগে বলতে গেলে ফসল এই একটাই। ধানের মণ ৯০০-১০০০ না অইলে পোষাইবে না ভাই।’
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক তথ্যে দেখা গেছে, গত এক বছরে (অক্টোবর/২০১৪ থেকে অক্টোবর/২০১৫) দেশের বাজারে মোটা চালের দাম খুচরা বাজারে ১৭ শতাংশ ও পাইকারি বাজারে ১৯ শতাংশ কমেছে।
বাধাহীন আমদানির এ পরিস্থিতির সৃষ্টির বড় কারণ বলে জানিয়েছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরে (২০১৪-১৫) দেশে মোট ৫২ লাখ ৭৪ হাজার ৩৬০ টন খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে (২০১৫-১৬) এ পর্যন্ত (৯ নভেম্বর) ১৫ লাখ দুই হাজার টন খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছে।
গত ১০ মে চাল আমদানির ওপর ১০ শুল্ক আরোপ করে সরকার। কিন্তু এরপরও থামছে না চাল আমদানি। বৃহস্পতিবার খাদ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কয়েক দিনের মধ্যে শুল্ক আরও বাড়ানো হচ্ছে।
স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা উবিনীগের (উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা) নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার  বলেন, ‘এবার আমন ভাল হয়েছে। তবে কৃষক ফসলের মাঠ দেখে চিন্তিত হচ্ছে, ভাবছে হয়ত সে তার দামটা পাবে না। আমি মনে করি এ বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতি থাকা উচিত। বাংলাদেশে কৃষির ভবিষ্যত কৃষকের ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করে। সরকারের ধানের মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত। এ মূল্যের নিচে কেউ কিনতে পারবে না। সরকারও সেই দামে কিনবে। তবেই কৃষক লাভবান হবে।’
‘আমাদের এখানে ফসল ভাল হলে যেখানে তাদের লাভের মুখ দেখার কথা সেখানে কৃষক অনেক সময় তিগ্রস্ত হয়। কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতে পারে না। সরকার যদি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দাবি করে তবে কৃষকদের ন্যায্যমূল্যের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কৃষককে ন্যায্যমূল্য না দিয়ে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ ভবিষ্যতে থাকবে না। কৃষকদের ধান উৎপাদন থেকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে,’ বলেন ফরিদা আখতার।
এ বছর প্রতি কেজি বোরো ধান উৎপাদনে ২০ টাকা ও চাল উৎপাদনে ২৭ টাকা ৫০ পয়সা খরচ হয়েছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে। সেই হিসেবে প্রতি মণ ধানের উৎপাদন মূল্য ৮০০ টাকা হলেও শেরপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, ঝিনাইদহ, ভোলা, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এর অর্ধেক দামে ধান বিক্রি করতে হয়েছে কৃষককে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী চলতি মৌসুমে প্রতি কেজি আমন ধানের উৎপাদন ব্যয় ১৮ টাকা ৫০ পয়সা। চালের উৎপাদন ব্যয় ২৮ টাকা ৫০ পয়সা।
গত বছর উৎপাদন খরচ পঞ্চাশ পয়সা কম থাকলেও সরকার ৩২ টাকা কেজি দরে আমন চাল সংগ্রহ করেছে। এবার এক টাকা কমিয়ে ৩১ টাকা দরে দুই লাখ টন আমন সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের দৈনন্দিন বাজার দর অনুযায়ী, বুধবার খুচরা বাজারে মোটা চালের দাম ২৯ থেকে ৩২ টাকা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও বীজ উইংয়ের মহাপরিচালক আনোয়ার ফারুক দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। আমনে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য বাজার এখন কৃষকের অনুকূলে নয়। কৃষকের ঘরে এখনো বোরো রয়ে গেছে। বাজারে চালের দামও কম। সরকারিভাবে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনলে কৃষককে কিছুটা লাভবান করা যায়।’
বাজার স্থিতিশীল রাখা ও কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সরকার প্রতি বছর অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে আমন সংগ্রহ করে থাকে। তবে এেেত্র ধানের পরিবর্তে সাধারণত মিলারদের কাছ থেকে চাল কেনা হয়। এতে কৃষকদের পরিবর্তে মিলার ও ফড়িয়ারা লাভবান হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সাম্প্রতিককালে সরকারের চাল সংগ্রহ কর্মসূচিতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা সম্পৃক্ত হওয়ায় লাভের ভাগটা তুলে নিচ্ছেন তারা।
ফরিদা আখতার এ বিষয়ে বলেন, ‘সরকারের সঙ্গে সরাসরি কৃষকের সম্পর্ক হওয়া উচিত। সরকার কিছু কিনলে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কিনবে। সরকারি ক্রয়ের মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগী থাকা মানে হল কৃষককে ঠকানো।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো কারণে ফসলহানি হলে তার জন্য কৃষক কোনো তিপূরণ পায় না। তারা দাবিও করে না। কিন্তু সে যখন পরিশ্রম করে ভাল ফসল ফলায় তখন মাঝখান থেকে অকৃষক লোকজন ফায়দা নেয়। এখানেই হয় অন্যায়টা।’
আমনে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত নিয়ে সরকারও দুশ্চিন্তায় রয়েছে বলে জানা গেছে। আমন সংগ্রহের পরিমাণ ও দাম নির্ধারণ করতে গত ২৯ অক্টোবর খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটি সভায় বসলেও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। সংগ্রহের আগে সরকার বাজারের মূল্য পরিস্থিতি আরও পর্যবেণ করেছে। গত বৃহস্পতিবার সভায় বসে ল্যমাত্রা ও মূল্য নির্ধারণ করা হয়। আমনে কৃষকের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব ও এফপিএমইউ’র মহাপরিচালক আতাউর রহমান বলেন, ‘আমরা তো কৃষি মন্ত্রণালয়ের উৎপাদন মূল্যের ওপর ভিত্তি করে বোরো ও আমন সংগ্রহ করি। এ ছাড়া বাজারে তো আমাদের সংগ্রহ মূল্যের চেয়ে কম দামেও ধান ও চাল বিক্রি হয়। আমরা কৃষকে লাভবান করার চেষ্টা তো করছি।’

আরোও পড়ুন...

HostGator Web Hosting