| |

সর্বশেষঃ

প্রতিটি দিন হোক শ্রমিকের দিন

আপডেটঃ 2:50 pm | May 01, 2021

= এস এম সৈকত =

বছর ঘুরে একটা দিন এলেই সবাই মে দিবস উদযাপন করে। এটা সমালোচনা না, বরং একটু বিবেচনার দরজায় টোকা দিয়ে শুরু করা। মে দিবসের ইতিহাস জানা শ্রমিকের সংখ্যার চেয়ে, শ্রমিক নেতার সংখ্যা, আর  মালিকের সংখ্যা আরো কম। এটা সমালোচনা হিসেবে নিলে খুশি হব। কারন ১৮৮৯ সাল থেকে কেন এই দিনটি সব শ্রমিকের, মালিকের, প্রত্যেক চাকুরিজীবি মানুষের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ সেটা এখনো গুরুত্ব পায়না আমাদের নাগরিক গবেষণায়। আজ থেকে প্রায় ১৩৫ বছর আগে ১৮৮৬ সালের ৪মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে-মার্কেটে শ্রমিকেরা ৮ ঘন্টা কর্মঘণ্টার দাবি জানিয়েছিল আর সেই শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি পুলিশের উপর বোমা নিক্ষেপ করার প্রেক্ষিতে পুলিশের পাল্টা গুলিতে এক নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হন অনেক শ্রমিক। সেই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এর তিন বছর পর ১মে কে শ্রমিক সংগঠনগুলো একযোগে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালনের আহবান করে। সেই থেকে এই দিনটি শ্রমিকদের জন্য ছুটি, স্মরণীয় আর নিপীড়নের প্রতিবাদ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

এই ইতিহাসের সাথে যে দেশটির নাম জড়িয়ে গেছে, সেখানে মানে খোদ আমেরিকায় সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার শ্রমিক দিবস পালন করা হয়। এই অমিলের গল্পটাও বেশ যুক্তিপূর্ণ। সাধারণত সেখানে  শনি আর রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকে যার কারণে কর্মসপ্তাহ শুরু হয় সোমবার। তাই শ্রমিক দিবস যেন কখনো ছুটির দিনে না পড়ে, বরং শ্রমিকেরা সেই দিনটা অতিরিক্ত ছুটি হিসেবে কাটাতে পারেন এর জন্যই এমন ব্যবস্থা। আর সেপ্টেম্বরের শুরুটা গ্রীষ্মের শেষ হিসেবে এই লম্বা সাপ্তাহিক ছুটি শ্রমিকদের ও তাদের পরিবারদের জন্য আলাদা বিশেষত্ব নিয়ে আসে। অর্থাৎ এইদিনে যেন কোন শ্রমিক কাজ না করেন এটা তাদের সংস্কৃতিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

তো এবার দেখি আমাদের দেশের এই ছুটির দিনটা কিভাবে আসে বাংলাদেশে। এবারের মে দিবস হয়েছে শনিবার, মানে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র, শনি থাকায় এই দিনটা অনেকের জন্য আলাদা কোন মাহাত্ম্য বহন করছেনা। দেশে কোভিড লকডাউনের কারণে অনেকে এমনিতেই বাসায় অবস্থান করছেন, তাদের জন্য এমন মনে হতেই পারে। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কল-কারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ছাপাখানা, সংবাদপত্র, চিকিৎসাসেবা, বাজার, নিরাপত্তাকর্মী, এমনকি গৃহস্থালি শ্রমিকদের জন্য হয়তো এই শুক্র, শনিবারের ছুটিও জুটে না। ভেবে দেখলে এই সময়টায় একজন নার্স, ডাক্তার, প্যাথলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, এমন নানা পেশার মানুষ যারা করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার সাথে সম্পৃক্ত তাদের ছুটি চিন্তা করাও কল্পনা। প্রশাসন, পুলিশ, আনসার, ফায়ার সার্ভিস, ব্যাংকার, মুদি দোকানের কর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, এই পেশার মানুষগুলোর ছুটি নেই। আমরা সব শ্রেণি পেশার মানুষদের জন্য ধরে নিই এই দিনটি তাদের শ্রম বিরতির দিন, অথচ শুধু একটা প্রশ্ন আমাদের সবাইকে চুপ করিয়ে দিতে বাধ্য- ঘরের গৃহকর্মীদের কি আজকের দিন আপনি ছুটি দিয়েছেন?

এসবের মধ্যে মে দিবস কতটুকু অর্থবহ তা আমরা নিজ বিবেচনায় রেখে দিই। বরং একটু অন্যভাবে দেখি, শ্রমিকের মর্যাদা কম যেখানে সেখানে দিবসের মর্যাদা নিয়ে অতিরঞ্জিত চিন্তার কিছু নেই। প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ শ্রমিক প্রবাসে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে গতবছর দেশে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা পাঠিয়েছেন। বিনিময়ে কতটুকু সুবিধা পান তারা। এয়ারপোর্টে নিয়মিত যাতায়াত করলে বুঝা যায় কতটা অসহায় হয়ে এখন শ্রমিক অপর কোন যাত্রীকে হাতজোড় করে বলছেন “ভাই আমার (ইমিগ্রেশন) কার্ডটা লিখে দিবেন!” একটা সামান্য ঝামেলায় পড়ার ভয়, হয়রানির আতঙ্ক তাদেরকে দেশ ছাড়া বা দেশে ফেরার সময় তাড়া করে। প্রতারকদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব শেষ করে বাড়িতে ফিরে যেতে হয় অনেকের। আরেকটা গল্প আছে, যাদের ভরসা করে মাসে মাসে টাকা পাঠাচ্ছেন তারা সেই পরিবার, আত্মীয়দের অনেকেই অর্থ আত্মসাৎ করে ফেলে। প্রায় ১০ হাজার প্রবাসী শ্রমিক এখনো বিদেশের মাটিতে জেলে আটক নানান কারণে। প্রবাসী কল্যাণ বিভাগ নাকি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোথায় কাকে বলতে হবে এটাও অনেকে জানেন না। মনে পড়ে প্রায় দুই বছর আগে আমি মালয়েশিয়া থেকে ফেরার সময় এয়ারপোর্টে একটা ছেলের সাথে দেখা। সে তার কাজের নোংরা জামা কাপড় নিয়ে ই ফ্লাইটে উঠছে। একটা নতুন জামা কেনার টাকা নেই। আমার কাছ থেকে ফোনটা ধার নিয়ে দেশে পরিবারকে জানালো সে ফিরে আসছে, তার সব শেষ। এইতো গতকালের নিউজ প্রায় ৪৭% বিদেশ ফেরত শ্রমিক বেকার এখন দেশে। আর প্রবাসের নারী শ্রমিকের জীবনের মূল্য তো মধ্যপ্রাচ্যের দেশের কোন ধনীর বাড়িতে পালিত কুকুরের চেয়েও কম। মেরে লাশ করে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিলো, কূটনৈতিক হিসাব নিকাশের কারনে বিচার নেই। কিছু আশা জাগানিয়া কথাও আছে, শ্রমিকদের বিদেশগমন নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়, প্রবাসী কল্যাণ বিভাগ তারা বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেছেন এই লক ডাউনের সময়ে। শুধু বলব, আরো অনেক পথ যেতে হবে।

লক ডাউনে গার্মেন্টস খুলে রাখা হয়েছে, কারখানা খোলা। কারন মালিকপক্ষের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হবে। এই মালিকেরাই আসলে দেশের সবকিছুর মালিক। বুঝলে ভালো না বুঝলে এইতো কয়েকটা দিন পর ঈদের বোনাস, বকেয়া বেতনের দাবিতে দেখবেন শ্রমিকেরা পথ আটকে বসে আছেন। প্রতিবছর এই সময়টা এলেই এমন দৃশ্য দেখতে হয়। কারন কি! ফ্যাক্টরী মালিকেরা কি সারাবছর লাভ করেন না? শ্রমিক না খেয়ে মরে গেলেও এদের অনেকের কিছু আসে যায়না। কিছু ব্যতিক্রম নেই তা নয়। এমনও ফ্যাক্টরী দেখেছি যেখানে মালিকপক্ষ মে দিবসের আগেই বেতন বোনাস দিয়েছেন। এটা শুধু সদিচ্ছার বিষয়। আসলে কথাটাকে আমি এক অনুজ শিশিরের ভাষায় লিখতে চাই, “কর্মক্ষেত্র যদি পরিবার আর তার প্রধান যদি সেই পরিবারের অভিভাবক হয় তাহলেই হয়তো শ্রমিক দিবসের স্বার্থকতা সরেজমিনে দেখা মেলে।”

এই তো কয়েকদিন আগে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেতন ভাতা চাওয়া, অতিরিক্ত সময় কাজের বিরোধিতা করা শ্রমিকদের উপর গুলি চালিয়ে ৫ জনকে মেরে ফেলা হলো। নিহত মানুষগুলোর জন্য ৩লাখ আর বেঁচে যাওয়া আহতদের জন্য ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে! বেশ তো বুঝে নিই শ্রমিকের মূল্য কত।

তাহলে ১৩২ বছরের আন্দোলন করে কি পরিবর্তন হলো! হয়েছে। মালিকপক্ষ, সমাজের উঁচুতলার কর্মজীবী, সরকারি চাকুরিজীবি, অথবা কর্পোরেট জগতে ৮ ঘণ্টা কাজের সময়, বোনাস, ছুটি, সবকিছুর উন্নতি হয়েছে। শুধু যারা আন্দোলন করে গিয়েছে শতবছর, তারা কিছুই পায়নি।

শ্রমিকদের শতবর্ষের এই সংগ্রামের সফলতা আসবে তখনই যখন প্রতিটা দিন হবে শ্রমিকের দিন। তাদের বিপদে-আপদে, খুশিতে, প্রয়োজনে কর্মক্ষেত্র, সরকারি কর্তৃপক্ষ, মালিক, উর্দ্ধতন মানুষগুলো যখন তাদের ভাষা বুঝবে, সমমর্মিতা ভিত্তিতে পাশে থাকতে পারবে এমন সময় আসা পর্যন্ত সবাই চেষ্টা করি। একটু সদিচ্ছাই এই সংগ্রামের শান্তিপূর্ণ সমাধান আনতে পারে।

লেখক: মানবাধিকারকর্মী ও বর্তমানে সিরাক-বাংলাদেশ এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কর্মরত।

Email: shaikatsm@gmail.com

HostGator Web Hosting