| |

সর্বশেষঃ

জামালপুরে লাল টুকটুকে রসে ভরা লিচু বাজারে

আপডেটঃ 4:34 pm | May 23, 2021

জামালপুর সংবাদদাতা : লিচুর নাম মুখে এলেই জিভে পানি এসে যায়। রসাল, সুমিষ্ট, সুঘ্রাণ ও গাঢ় লাল রঙের বৈশিষ্ট্যের কারণে লিচুর খ্যাতি জামালপুর ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জায়গা করে নিয়েছে।

জেলার বিভিন্ন হাট বাজারে লাল টুকটুকে রসে ভরা লিচুতে ছেয়ে গেছে পুরো জেলার হাট-বাজার। শুরু থেকেই লিচুতে কীটনাশক স্পেসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে কৃষি বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ। সেই সঙ্গে চাষিদের আরো ব্যাপক হারে লিচু চাষ করার উদ্বুদ্ধও করেন তারা।

জামালপুর সদর উপজেলার শরিফপুর ইউপির গ্রামে প্রবেশের পথে চোখে পড়ে সারি সারি লিচু গাছে সিঁদুর রঙের লিচু। বাতাসের তালে তালে পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে লাল টুকটুকে লিচু। প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনা, ঘরের পাশে এবং রাস্তার ধারে সারি সারি লিচু গাছ দেখেই বোঝা যায় এটি একটি লিচুর গ্রাম। কমবেশি সবার বাড়িতেই রয়েছে লিচু গাছ। এ লিচুর ফলন প্রচুর ও কদর বেশি থাকায় এর চাষ এলাকার মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।

বছরের শুরু থেকেই জামালপুরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারি ও খুচরা লিচু কিনতে গ্রামে আসছে ক্রেতারা। এতে এলাকার অধিকাংশ পরিবারই আজ লিচু চাষই জীবন-জীবিকার অন্যতম উপায় হিসেবে বেঁছে নিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব এলাকায় লিচু গাছের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই লিচুর নার্সারি গড়ে তুলেছেন। নার্সারিতে বিভিন্ন জাতের চারা তর তর করে বেড়ে উঠছে। নার্সারির চারা খুচরা ও পাইকারী দুইভাবেই বিক্রি হয়ে থাকে। অনেকেই ভ্যানে করে হাটবাজারে কিংবা গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে লিচুর চারা বিক্রি করেন।

স্থানীয় জাত ছাড়াও চায়না, চায়না-৩, মঙ্গলবাড়ি, বোম্বাই জাতের লিচুর আবাদ হচ্ছে। প্রথমে অনেকেই শখের বসে বাড়িতে লিচু গাছ রোপণ করলেও পরে আস্তে আস্তে গাছের সংখ্যা বাড়াতে থাকেন। বাড়ির আঙিনা, ক্ষেতের আইলে, রাস্তার পাশে, প্রতিষ্ঠানের চারিদিকে লিচু গাছ শোভা পাচ্ছে।

জামালপুর পৌর শহর ছাড়াও নান্দিনা, শরিফপুরসহ প্রত্যন্ত গ্রামীণ বাজারগুলোতে দেদারছে বেচাকেনা হচ্ছে রসালো লিচু। গত দুই দশক আগে জামালপুর সদরের শরিফপুর ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামে গৃহস্তের বাড়িতে দু-একটি লিচু গাছ ছিলো। কিন্তু চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় লিচু এখন বাণিজ্যিকভাবে আবাদ হচ্ছে।

শ্রীরামপুর গ্রাম ছড়িয়ে লিচু এখন প্রতিবেশী গোদাশিমলা, রাঙ্গামাটিয়া, শরিফপুর, ছোট জয়রামপুর, বড় জয়রামপুর, শ্যামপুর, রঘুনাথপুর, হামিদপুর, রণরামপুর, খলিশাকুড়ি, বাদেচাঁন্দি, ঢেংগারগড়, বেড়াপাথালিয়া গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে লিচু চাষ হচ্ছে।

শরিফপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ছাড়াও প্রতিবেশি রানাগাছা, বাঁশচড়া, শ্রীপুর গ্রামেও প্রচুর লিচুর আবাদ শুরু হয়েছে। ফলে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করে দু’পয়সা আয় করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

জামালপুর শহরের গেইটপাড় গিয়ে দেখা যায়, ফুটপাতে বাহারি জাতের লিচুর পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। কেউ কেউ বাগান থেকে লিচু তুলে অটোরিকশা দিয়ে বিক্রির জন্য নামাচ্ছেন। কেউ আবার ছোট বড় আলাদা করছেন। সকালে ছুটে যান বাগনে। ৯টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যেই শহরের নির্দিষ্ট স্থানে পসরা সাজিয়ে বসেন। বিক্রি করেন সন্ধ্যা পর্যন্ত।

শহরের খুচরা পাইকার লিটন ঢেংগারগড় পাহাড় থেকে লিচু তুলে অটোরিকশা দিয়ে গেইটপাড়ে ফুটপাতে বিক্রির জন্য জড়ো করছেন। তিনি জানান, আগাম জাতের একটি লিচু বাগান কিনেছেন। ওই বাগান থেকে প্রতিদিনই লিচু তুলে এনে শহরে বিক্রি করেন। প্রকার ভেদে ১শ লিচু ৩৫০ টাকা থেকে সর্বনিম্ন ২০০ টাকায় বিক্রি করেন।

শহরের সকাল বাজার, রেলস্টেশন, দয়াময়ী মোড়, স্টেশন বাজার, তমালতলা, ফৌজদারি মোড়, পাঁচরাস্তা, বোর্ডঘর বাজার, কম্পুপুর, চন্দ্রাঘুন্টি, বেলটিয়া বাজার, জামালপুর-শেরপুর ব্রিজ, বানিয়া বাজারে প্রচুর লিচুর বেচা-কেনা হচ্ছে।

রানাগাছা ইউনিয়নের কানিল গ্রামের লিচু চাষি সেলিম বলেন, ১২ বছর আগে বগুড়া থেকে চায়না-৩ জাতের চারা এনে বাগান করেছি। বাগানে লিচুর চারা রোপণের দুই বছরের মাথায় লিচু ধরা শুরু হয়েছে। বাগানে বর্তমানে প্রায় দেড় শতাধিক লিচুর গাছ রয়েছে। একেকটি গাছ থেকে প্রতি বছর ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার লিচু বিক্রি হয়ে থাকে।

তিনি আরো জানান, বাজারে দেশী লিচুর চেয়ে চায়না-৩ জাতের লিচুর দাম কিছুটা বেশি। পাইকাররা বাগান থেকে প্রতি শ’ লিচু আড়াই থেকে তিনশ’ টাকায় কিনে নেন। বর্তমানে দেশি লিচু প্রতি শ’ খুচরা বিক্রি হচ্ছে দুই থেকে আড়াইশ’ টাকায়। বাগান থেকে পাইকারিভাবে বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা থেকে ১৫০ টাকায়।

কানিল গ্রামের সাদেক জানান, এক দশক আগে এক একর জমিতে লিচুর বাগান করেন তিনি। তার বাগান থেকে জেলার পাইকাররা এসে লিচু কিনে নিয়ে যায়। ওই বাগান থেকে তিনি প্রতি বছর ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার লিচু বিক্রি করে থাকেন।

শ্রীরামপুরের বাসিন্দা আব্দুল মোতালেব মাস্টার জানান, তার বাড়িতে গত প্রায় ৩০ বছর ধরে প্রায় ২০টি লিচু গাছ রয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা গাছ থেকে লিচু কিনে নিয়ে যায়। ফলে প্রতি বছর বিশাল অঙ্কের টাকায় লিচু বিক্রি করে আয় করেন।

লিচু বাগান মালিক শাহ আলী জানান, মৌসুম শুরুর আগেই অনেকে লিচুর জন্য আগাম টাকা দিয়ে যান। দেশ-বিদেশে থাকা এ গ্রামের আত্মীয়-স্বজনরাও লিচুর মৌসুমের জন্য মুখিয়ে থাকেন। লিচু পাকার সময়ে তারা ছুটে আসেন স্বজনের বাড়িতে। প্রচুর চাহিদা থাকার কারণে বিভিন্ন স্থান থেকে লিচুর চারা এনে তার বাড়ির আঙিনায় রোপণ করে গাছের শাখায় কলম করে লিচু চাষ সম্প্রসারণ করেন জামালপুর সদর উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নকে আজ লিচুর গ্রাম হিসেবেই পরিচিত লাভ করছে।

জামালপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তা ড. রফিকুল ইসলাম জানান, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় লিচুর ফলন ভালো হয়েছে। লিচু আবাদে খরচ কম, লাভ বেশি বিধায় এর চাষ দিন দিন বাড়ছেই।

এছাড়াও জেলার সরিষাবাড়ি, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ, মাদারগঞ্জ, মেলান্দহের হাট-বাজারে আগাম জাতের লিচু বেচাকেনা চলছে। কৃষি বিভাগ থেকে গাছ মালিকদের সঠিক পরামর্শ, রোগ প্রতিরোধে ওষুধ স্প্রেসহ সব ব্যবসার জন্য মাঠকর্মী পর্যায়ে নিয়মিত খোঁজ খবর নেয়।

HostGator Web Hosting