সংবাদ শিরোনাম

 

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলাটি এক তৃতীয়াংশ জুড়ে রয়েছে বিশাল পাহাড়ি বনাঞ্চল। এসব পাহাড়ি বনাঞ্চল জুড়ে রয়েছে শাল,গজারি ও বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। এছাড়াও বিস্তৃত এলাকা জুড়ে রয়েছে সংরক্ষিত সামাজিক বনায়ন। বনাঞ্চলের এ সব গাছ এক দিকে যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ,খরা অক্সিজেন নিঃসরণ,কার্বনডাই অক্সিজেন গ্রহণ ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে অপর দিকে এ সব বনাঞ্চলে বসবাস করে বানর, হনুমান,কাঠ বিড়ালি সহ বিভিন্ন প্রজাতির পশু পাখি।

কিন্তু এক শ্রেণীর অবৈধ করাতকল মালিক ও বন খেকোদের যোগসাজশে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে হাজার বছরের ঐতিহ্য মণ্ডিত বনাঞ্চল।রাত দিন সমান তালে চলে বন নিধনের কাজ। প্রকাশ্যে শাল,গজারি গাছ কাটছেন অবলীলায়। প্রশাসন ও বন বিভাগের লোকেরা চোখ ও কান বন্ধ করে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। রক্ষক হয়ে ভক্ষকের কাজটি তারা সঠিক ভাবেই পালন করে যাচ্ছে। এগুলো দেখার যেন কেউ নেই।

এখানেই শেষ নয়। এসব বনাঞ্চলের গাছ কেটে রাতের আঁধারে করাতকলে নিয়ে রাতেই গাছ চিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবাধে বিক্রি করছে। নিজেদের সুবিধার জন্য বনাঞ্চল ঘিরেই গড়ে উঠেছে অবৈধ শতাধিক করাতকল। স্থানীয় বন কর্মকর্তাদের তালিকা অনুযায়ী সংরক্ষিত বনে করাতকলের সংখ্যা ১০১টি। তবে স্থানীয়দের দাবি, অবৈধ করাতকলের সংখ্যা দুই শতাধিক।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসন বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কাঠ ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় এসব করাতকল পরিচালিত হচ্ছে।
বনের ভেতরে অবৈধ করাতকল থাকার কারণে সংঘবদ্ধ কাঠ চোরেরা শাল,গজারি ও সামাজিক বনায়নের গাছ রাতের আঁধারে কেটে সাবাড় করে দিচ্ছে।

সম্প্রতি উপজেলা বন কমিটির সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য আতাউর রহমান খান অবৈধ করাতকলের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযানের দাবি জানান।

স্থানীয় বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ঘাটাইল উপজেলার ধলাপাড়া রেঞ্জের আওতায় রয়েছে বটতলী, ঝরকা, চৌরাসা, দেওপাড়া, ধলাপাড়া ও সাগরদিঘী এই ৬টি বিট। এই রেঞ্জের আওতাধীন বন বিভাগের পরিমাণ ৮৮.৪৫ বর্গকিলোমিটার। আর ৪৯টি মৌজায় বন বিভাগের সংরক্ষিত বনভূমির পরিমাণ ২৯ হাজার ১০৬ একর। আর বিশাল এই বনভূমিতে রয়েছে শাল, সেগুন, গজারিসহ বিভিন্ন প্রজাতির সামাজিক বনায়নের গাছ। বন আইনে সংরক্ষিত বন এলাকার ১০ কি.মি. মধ্যে করাতকল স্থাপনের বিধিনিষেধ রয়েছে।

কিন্তু বিধিনিষেধ অমান্য করে সংরক্ষিত শাল গজারির বন ঘেঁষে, সামাজিক বনায়নের ভেতর অবৈধ করাতকল স্থাপন করা হয়েছে।

এসব করাতকলে অবাধে চিরানো হচ্ছে শাল গজারিসহ সামাজিক বনায়নের কাঠ।

স্থানীয় প্রশাসনের মৌখিক অনুমতি নিয়েই চলে এসব করাতকল। বছরের পর বছর এসব অবৈধ করাতকল পরিচালিত হলেও স্থানীয় প্রশাসনের কোনো অভিযান না থাকায় সংরক্ষিত বন এলাকা বিরানভূমিতে পরিণত হতে চলেছে।

সংরক্ষিত বন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ধলাপাড়া, সাগরদিঘী, দেওপাড়া, গারোবাজার, মাকরাই, ছনখোলা, বটতলা, নলমা, কুশারিয়া, পেচারআটা, মাইধারচালা, কাজলা, দেওজানা, চাপড়ি, মুন্সিগঞ্জ, মানিকপুর, বোয়ালীহাটবাড়ী, শহরগোপিনপুর, জোড়দিঘী, মুরাইদ, লখিন্দর, সিংহেরচালা, শিবেরপাড়া, মালেঙ্গা, মোমিনপুর, বগা ও ফকিরচালা এলাকায় বেশির ভাগ অবৈধ করাতকলগুলো স্থাপন করা হয়েছে।

এলাকাবাসী জানায়, বনের ভেতরে স্থাপিত এসব করাতকলের প্রায় অধিকাংশের মালিক কাঠ ব্যবসায়ীরা। আর কাঠ চোরদের সাথে করাতকল মালিকদের রয়েছে দহরম মহরম সম্পর্ক। সংঘবদ্ধ কাঠ চোরদের কারো কারো করাতকল রয়েছে আবার কেউ অংশীদার। অর্থাৎ করাতকল মালিক ও কাঠ চোররা মিলেমিশে সংরক্ষিত বনের গাছ নিধনের কাজে নিয়োজিত। আবার প্রায় সময়ই লক্ষ করা যায় টাঙ্গাইল- ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাকুটিয়াতে(বটতলা)যত্র তত্র রাস্তার উপর গাড়ি দাঁড় করিয়ে কাঠ নামানো ও লাকড়ি বোঝাই করা হয়।

এ বিষয়ে পৌর করাতকল মালিক সমিতির সভাপতি আ. হালিম মিয়া বলেন, ঘাটাইল উপজেলায় মোট করাতকল রয়েছে ২০৩টি এর মধ্যে লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ২৮টি করাতকলের। অবৈধ করাতকলের কারণে একদিকে সরকার হারাচ্ছে কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব অপরদিকে নির্বিচারে বনের গাছ কাটার কারণে বনভূমি উজাড় হচ্ছে। অবৈধ করাতকল উচ্ছেদের জন্য দ্রুত অভিযানের দাবি জানান তিনি।

উপজেলা চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম লেবু বলেন, বনের ভেতর স্থাপিত অবৈধ করাতকল বন্ধ করার বিষয়ে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি, উপজেলা বন কমিটি ও উপজেলা পরিষদের সভায় আলোচনা হয়েছে। অতিদ্রুত অবৈধ করাতকল উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ ব্যাপারে ধলাপাড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ধলাপাড়া রেঞ্জের আওতায় ১০১টি অবৈধ করাতকল রয়েছে। এসব অবৈধ করাতকলের তালিকা স্থানীয় প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রদান করা হয়েছে। তাদের নির্দেশনা মোতাবেক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


মতামত জানান :

 
 
আরও পড়ুন
 
কপিরাইট © ময়মনসিংহ প্রতিদিন ডটকম - সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | উন্নয়নে হোস্টপিও.কম