সংবাদ শিরোনাম

 

শহরের কোলাহল পুর্ণ জীবন, ইট-পাথর আর কংক্রিটের গাথুনী আর বছর জুড়ে কর্মব্যস্ততার মাঝে জীবন যখন অতিষ্ঠ তখন থেমে যায় কর্মচাঞ্চল্য। সবাই চায় এ সময় প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে। জীবনের এক ঘেয়ামী আর ক্লান্ত পরিশ্রান্ত মনকে প্রফুল করতে শহর ছেড়ে চলে আসতে যায় শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের প্রকৃতির নৈসর্গিক শোভামন্ডিত পানিহাটা-তারানি নামক পাহাড়ী এলাকায়। বিশেষ করে এবারের করোনাকালিন সময় অতিবাহিত হওয়ায় মানুষ দীর্ঘদিন ঘরে থাকায় বাইরে ঘুড়াঘুড়ি করার সুয়োগ হয়নি তাই এবার শীতেই এই পাহাড়ী পর্যটন অঞ্চলে দশানার্থীদের আগমন সর্বোচ্চ হতে পারে বলে এলাকাবাসীর ধারনা।
এখানকার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুড়া জেলার সীমান্ত ঘেষা প্রাকৃতিক ঘন সবুজ শ্যামল বন, খরস্রোতা পাহাড়ী ভোগাই নদীর সাথে মিতালী আর বৃক্ষরাজি দেখে ভ্রমন পিয়াসীদের মন উদ্বেলিত হয়। তারা কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলে যান শহরের জীবনের কর্মক্লান্তি। প্রকৃতির নিখুত ভালবাসায় হারিয়ে যান তারা স্বপ্নের রাজ্যে।

পানিহাটা-তারানির সৌন্দর্য্য:
স্থানটি ভারত সীমানা ঘেষা হওয়ায় চির সবুজ বাংলা মায়ের অপরুপ দৃশ্য দেখার পাশাপাশি ভারতের সবুজ বনানী দর্শনার্থীদের অনেক বেশি মনের তৃপ্তি মেটায়। পানিহাটা পাদ্রি মিশনের পশ্চিম পাশে উঁচু পাহাড়ে দাঁড়িয়ে উত্তর দিকে চাইলে চোখে পড়ে নীলাভ-চিরসবুজ ভারতের পাহাড়ী তুরা জেলাকে আবছা আবরণের চাদরে জড়িয়ে নিয়েছে কুয়াশার মতো মেঘ কখনো বা কুয়াশা নিজেই। দূরের টিলাগুলো কেবলই লুকোচুরি খেলে এরই আড়ালে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ছোট ছোট পাহাড় গুলোকে ফাঁকি দিয়ে তুড়ার অববাহিকা থেকে সামনে সোজা এসে পশ্চিমে চলে গেছে পাহাড়ি খরস্রোতা নদী ভোগাই। এক পাশে তার কাশবন আর অপর পাশে শত ফুট উঁচু দাঁড়িয়ে থাকা সবুজে জড়ানো পাহাড় ও নদী। নদীর টলটলে স্বচ্ছ পানির নিচে গড়াগড়ি খাচ্ছে নুড়ি পাথর গুলো।

সামনের একশ গজ দূরে উত্তরে ভারত অংশে পিঁচ ঢালা আকাবাঁকা রাস্তা পূর্ব থেকে পশ্চিমে পাহাড়ের বুক চিরে চলে গেছে। আর মাঝে মধ্যেই হুসহাস করে ছুটে চলছে মালবাহী ট্রাক গুলো। চারদিকে ছোট ছোট অসংখ্য পাহাড়ের সারি সারি পাহাড়। পূর্ব দিকের কয়েকটি পাহাড়ের গা ঘেঁষে ভোগাই নদীতে এসে মিশেছে ছোট একটি পাহাড়ি ঝরণা। তার পাশেই খ্রিষ্টান ধর্মালম্বীদের উপাসনালয় পানিহাটা পাদ্রি মিশন। এখানে আছে ছোট একটি চিকিৎসা কেন্দ্র, বিদ্যালয় আর ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের থাকার হোস্টেল। সেখানে শিশু-কিশোরদের কোলাহল।

এসব মিলে প্রকৃতি প্রেমীদের প্রতিনিয়ত আকর্ষণ করে অপরূপা পানিহাটা-তারানি পাহাড়। অবশ্য এলাকার জনগন এ পাহাড়টিকে পানিহাটা নামেই জানেন। কিন্তু এই সৌন্দর্য্যরে ভাগটা শুধু পানিহাটাই নিতে পারেনি। এর একটা অংশে ভাগ বসিয়েছে পাশের তারানি গ্রামের পাহাড়। তাই দর্শণার্থীদের জন্য পানিহাটা-তারানি দুটো মিলেই গড়ে উঠতে পারে পর্যটন কেন্দ্র। সবুজ চাদরে ঘেরা গারো পাহাড়ে প্রিয়জনকে সাথে নিয়ে চলে যান প্রকৃতির রাজ্যে।
যারা শুনেছেন শেরপুরের বন্যহাতির তান্ডব তারা মিশনের পুর্বপাশে গারো উপজাতি পল্লীর অধিবাসীদের কাছ থেকে শুনতে পারবেন বন্যহাতির ধংস লীলার কথা।

মার্তৃ তান্ত্রিক ব্যবস্থার অধিনে পরিচালিত গাড়োদের পরিবার প্রধান নারীরা। তাদের সহজ-সরল জীবন যেন ভ্রমন পিয়াসীদের অবাক করে দেয়। তাদের জীবন সংগ্রাম কাছে থেকে দেখারও সুযোগ পাবেন এ গ্রামে। দারিদ্র আর বন্যহাতির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা এসব গারো উপ-জাতিদের জীবনযাত্রা ও অকৃত্রিম আতিথিয়েথা দেখে মুগ্ধ হন ভ্রমন পিয়াসীরা। বর্তমান কৃত্রিমতার যুগে প্রকৃতির নির্মিত সবুজ বনানী দেখে কর্মক্লান্তি ভুলে অনাবিল আনন্দে দিনের আলোতেই ভ্রমন পিয়াসীরা ফিরে যান নিজ ঘরে।

স্থানীয়রা বলেন, অপার পর্যটন সম্ভাবনাময় পানিহাটা-তারানি পাহাড় এলাকাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে এখানে প্রতিবছর দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ভীড় জামান। এখানে সরকারিভাবে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুললে সরকার বিপুল পরিমানে রাজস্ব পাবেন।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান খোরশেদ আলী খোকা বলেন, সরকারের সদিচ্ছা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নীতকরণসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে এ স্থানটি আকর্ষণীয় একটি পর্যটন কেন্দ্রের পাশাপাশি রাজস্ব আয়ের মাধ্যমে সরকারের কোষাগার সমৃদ্ধ হতে পারে।

এর আগে যোগাযোগ ব্যবস্থা নাজুক থাকলেও বর্তমানে অনেকটা উন্নত হয়েছে। সেই সঙ্গে সরকারি বা সরকারের সহযোগিতায় বেসরকারি উদ্যোগে এখানে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব।

যেভাবে আসা যাবে :
ঢাকার মহাখালী থেকে রওনা দিয়ে শেরপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কি.মি. সোজা উত্তর দিকে নিজস্ব পরিবহন বা সিএনজি যোগে সড়ক পথে সরাসরি চলে নাকুগাঁও স্থলবন্দর এলাকায় আসা যায়। ভোগাই নদীর ব্রীজের উপর দিয়ে পুর্ব দিকে প্রায় ২-৩ কি.মি. যাওয়ার পর ঘন সবুজ পাহাড় মাড়িয়ে উত্তর দিকে পানিহাটা-তাড়ানি পাহাড়। বিনা টিকিটে উপভোগ করা যায় প্রকৃতির নয়না ভিরাম দৃশ্য। যদি কেউ নালিতাবাড়ী উপজেলা শহর থেকে আসতে চায় তাহলে সড়ক পথে প্রায় ১৯ কিলোমিটার দূরে রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নে অবস্থিত এ স্থানটি।

শহরের গড়কান্দা চৌরাস্তা মোড় থেকে সোজা উত্তরে প্রথমে নাকুগাঁও পরে পূর্ব দিকে মোড় নিয়ে সৌন্দর্য মন্ডিত ভোগাই ব্রিজ পাড়ি দিতে হবে। এরপর সোজা পূর্ব দিকে প্রায় আড়াই থেকে তিন কিলোমিটার গেলে চায়না মোড়। এ মোড়ে এসেই আবারও গতিপথ বদলিয়ে যেতে হবে সোজা উত্তরে।

এ রাস্তা ধরে প্রায় এক কিলোমিটার গেলেই পানিহাটা-তারানির সবুজ শ্যামলময় পাহাড়ী এলাকা। সেখান থেকে ভিতরে ঢুকতেই দেখতে পাবেন সবুজের সমারোহ। ব্যক্তিগত উদ্যোগে রিকশা, সিএনজি অটোরিশা বা ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেলেও যাওয়া যায় জেলা শহর থেকে আর নালিতাবাড়ী শহর থেকে মাত্র ৩৫-৪৫ মিনিটের ব্যবধানে এবং অল্প খরচের মধ্যেই চলে যাবেন আপনার গন্তব্যে। আরেকটি নতুন রাস্তা নালিতাবাড়ী টু কাকরকান্দি হয়ে রামচন্দ্রকুড়ার রাস্তা ধরে ২৫ কিঃ মিঃ যাওয়ার পরেই সরাসরি পানিহাটায় যাওয়া যায়। ইতি মধ্যেই এই রাস্তাটির কাজ শেষ হয়েছে।

বেলা শেষে জেলা শহর বা উপজেলা সদরের হোটেলে আবাসিক হোটেলে রাত যাপন করা যাবে। এছাড়াও রয়েছে সরকারী ডাকবাংলো।


মতামত জানান :

 
 
আরও পড়ুন
 
কপিরাইট © ময়মনসিংহ প্রতিদিন ডটকম - সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | উন্নয়নে হোস্টপিও.কম