সংবাদ শিরোনাম

 

‘আশ্বিন গেল কার্তিক মাসে পাকিল ক্ষেতের ধান, সারা মাঠ ভরি গাহিছে কে যেন হলদি কোটার গান। ধানে ধান লাগি বাজিছে বাজনা, গন্ধ উড়ায় বায়ু, কলমি লতায় দোলন লেগেছে, ফুরাল ফুলের আয়ু।’ —পল্লীকবি জসীম উদদীন হেমন্তের এমন বর্ণনা দিয়েছেন তার ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কবিতায়। এ সময়ে মাঠে মাঠে পড়ে থাকে হলুদ পাকা ধান। কৃষাণ-কৃষাণীর ব্যস্ততা পাকা ধান ঘরে তোলার । পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধ ছড়ায় চারদিক। এ সময়ে বৃক্ষশাখা থেকে ফুল-পাতা ঝরে পড়ে। কিছুদিন চলে প্রকৃতিতে শূন্যতা ও রিক্ততার প্রকাশ।

প্রকৃতিতে বছর ঘুরে আজ এসেছে হেমন্ত। হেমন্ত হল ষড়ঋতুর চতুর্থ ঋতু। কার্তিক-অগ্রহায়ণ দুই মাস হেমন্তকাল। বিকেলগুলো এখন স্বল্পায়ু। দিন আরো ছোট হয়ে আসবে ক্রমেই। হেমন্ত মানেই শিশিরস্নাত প্রহর। শরতের কাশফুল মাটিতে নুইয়ে পড়ার পরপরই হেমন্তের আগমন ঘটে। এর পরে আসে শীত, তাই হেমন্তকে বলা হয় শীতের পূর্বাভাস। হেমন্তে সকালবেলা আবছা কুয়াশায় ঢাকা থাকে চারদিকের মাঠঘাট।

সকালে ধান গাছের ডগায় যে শিশির জমে থাকা তা হেমন্তের জানান দেয়। সকালের প্রথম রোদের বর্ণচ্ছটায় গাছের পাতাগুলো খিলখিল করে হেসে ওঠে। দৃষ্টিসীমা যতদূর গিয়ে পৌঁছে দেখা যায়, আলোকজ্জ্বল অপূর্ব একটি সকাল তার অভাবনীয় সৌন্দর্য নিয়ে অপেক্ষমান। গাছেদের নরম-কচি পাতাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে মিষ্টি রোদ আর সুনীল আকাশ যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। হেমন্তের রাতে মেঘমুক্ত আকাশে জোৎস্নার আলো যেন অন্য সময়ের চেয়ে একটু বেশি ঠিকরে পড়ে।

গ্রাম বাংলার অনবদ্য রূপ সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ কবি সুফিয়া কামাল পল্লী প্রকৃতির সহজ সরল ও স্বাভাবিক রূপ তাঁর কাব্যে উপজীব্য হয়ে উঠেছে। গভীর মমতায় ও ভালোবাসায় প্রকৃতি তার অন্তরঙ্গ অনুভবের সংশ্লিষ্টতায় অপূর্ব সৌন্দর্যে আবিভূত হয়েছে পল্লী-বাংলার পরতে পরতে। ‘হেমন্তের কবি আমি, হিমাচ্ছন্ন ধূসর সন্ধ্যায়, গৈরিক উত্তরীয় টানি মিশাইয়া রহি কুয়াশায়।’ আবার কখনো তিনি হেমন্তকে চিঠি লিখে বাংলার সবুজ শ্যামল প্রকৃতিতে আবিভূত হওয়ার আহ্বান ও জানিয়েছেন। ‘সবুজ পাতার খামের ভেতর, হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে, কোন পাথারের ওপার থেকে, আনল ডেকে হেমন্তকে?’

হেমন্ত এক আশ্চর্য ঋতু—মৃত্যু ও জীবনের, দুর্ভাগ্য ও সৌভাগ্যের, হতাশা ও আশার—দুই বিপরীতের এক সুতীব্র যুগলবন্দি। একদিকে এ ঋতুর শুরুতে মরা কার্তিক, ক্ষুধার হাহাকার; আবার শেষে অগ্রহায়নে ধানের প্রাচুর্য, নতুন ধান, তাই নবান্ন। এভাবে নানা বৈপরীত্যের মিশেল এই ঋতু হেমন্ত।

এক সময় হেমন্তের নতুন ধান ঘরে তোলা উৎসব —নবান্ন ঘিরে গ্রামে গ্রামে চলত পিঠা-পুলি ও ক্ষীর-পায়েসের উৎসব। হেমন্তে ধান কাটা উৎসবে যোগ হতো সারি সারি গরু ও মহিষের গাড়ি। মাঠে মাঠে কৃষকরা দল বেঁধে ধান কাটা উৎসবে যোগ দিতেন। আর গেয়ে উঠতেন জারি-সারি, ভাটিয়ালিসহ নানা ধরনের গান। হেমন্তে এখন উৎসব যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। গ্রামের পিঠা এসে যোগ হয়েছে শহরের হোটেল ও ফাস্ট ফুডের দোকানে। হেমন্তে ধান কাটা উৎসবে আর দেখা মেলে না সারি-সারি গরু ও মহিষের গাড়ি। এখন সেখানে যোগ হয়েছে ইঞ্জিনচালিত যান বা রিকশা ভ্যান। কিন্তু এখন আর সেই ঐতিহ্য নেই।


মতামত জানান :

 
 
 
কপিরাইট © ময়মনসিংহ প্রতিদিন ডটকম - সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | উন্নয়নে হোস্টপিও.কম