সংবাদ শিরোনাম

 

কার্তৃকের শেষে এবং অগ্রহায়ণের শুরুতে মাঠে মাঠে ফসলের সোনালী রং চারদিকে নতুন এক বার্তা নিয়ে আগমন ঘটে। এসময় কৃষককে উপহার দেয় সোনালি দিন। তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফলানো সোনালি ধানের সগৌরব বুকে ধারণ করে। কৃষকরা ধান কাটার মহোৎসবে ব্যাস্ত হয়ে পরে।

এ সময় ফসলের ক্ষেত ভরে ওঠে সোনালি ধানের হাসিতে। সেই সাথে কৃষকের মুখেও হাসি ফোটে সোনালি ফসল ঘরে ওঠার আনন্দে। শুরু হয় নবান্ন উৎসব। বিপুল বিস্ময়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও গেয়ে ওঠেন “ওমা ফাগুনে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি”।

 

 

নবান্ন হচ্ছে হেমন্তের প্রাণ। নতুন ধানের চাল দিয়ে তৈরি পিঠা, পায়েস, ক্ষীরসহ নানা রকম খাবারে মুখরিত হয়ে ওঠে বাঙালির প্রতিটি ঘর। নতুন ধানের পিঠা-পায়েসের ঘ্রাণে ভরে ওঠে চারপাশ। নতুন ধান ঘরে আসার পর শুরু হয় চালের তৈরি পিঠাপুলি খাওয়ার নবান্ন উৎসব। বাঙালির ঘরে ঘরে নবান্নের হইচই পড়ে যায়। চিরাচরিত এ উৎসব আমাদের সংস্কৃতির শেকড়ের অংশ।

এসময় বাঙালীদের আথিতিয়িতা বেড়ে যায়। নতুন জামাই বাড়িতে আসে। শুরু হয় অন্যরকম এক আনন্দ। এসময় কৃষাণিরা নতুন ধানের চাল থেকে ফিরনি, পায়েশ, পিঠা-পিটুলি তৈরি করে আত্মীয়স্বজন নিয়ে তা পরমানন্দে ভোগ করে এবং পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে বিতরণ করে থাকে। পাড়ায় পাড়ায় চলে নবান্ন উৎসব।

তেমনি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে আমনের আগাম ফলনে ফসল কাটার ধুম পরেছে। বাড়িতে বাড়িতে আসছে নতুন ধান। নতুন ধানের সুঘ্রাণে শীতের আকাশ মৃষ্ঠ হয়ে উঠেছে। প্রতিটি বাড়ির উঠানে নতুন ধানের স্তুুব। ব্যাস্ত কৃষক কৃষাণীরা। সবুজে ঘেরা মাঠ সোনালী ফসলে ভরে উঠার সাথে সাথেই তাদের মনে হাজারো স্বপ্ন বাসা বাঁধতে থাকে। পরিবর্তী ফসল আসার আগ পর্যন্ত সমস্ত সাংসারিক খরচ এই আগত ফসলকে ঘিরেই। ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনা, চাহিদা সকল আবদার সোনালী এই ধান বিক্রি করেই পূরণ করা হয়। তাই সকল কৃষদের আশির্বাদ হয়ে আসে এই ফসল।

 

 

উপজেলার পৌরসভা, ডাংধরা, চর আমখাওয়া, পাররামরামপুর, হাতীভাঙ্গা, বাহাদুরাবাদ, চিকাজানী, চুকাইবাড়ী ও দেওয়ানগঞ্জ ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠ ঘুরে বিস্তৃত সোনালী ফসল চোখে পড়ে। সবুজে ঘেরা মাঠ কিছুদিনের ব্যাবধানে সোনালী রূপ ধারণ করেছে। এইতো কয়েকদিন আগেও মাঠে মাঠে সবুজ ফসলে ভরে ছিল। আজ তা কৃষকের স্বপ্নে রূপান্তরিত হয়েছে। কৃষকের এই উৎসব সকল শ্রেণী পেশার মানুষের মাঝে ক্ষনিকের আনন্দ বয়ে তুলে।

উপজেলা কৃষি অফিসের অথ্য অনুয়ায়ী, এ মৌসুমে রোপা-আমন জাতীয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশী উৎপাদন হয়েছে। উপজেলায় জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছিল ৮৪৫৪ হেক্টর জমিতে। অপরদিকে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়ে চাষ হয় ৮৫০০ হেক্টর জমিতে। বর্তমানে ২০% জমিতে ধান কাটা হয়েছে। বাকি জমিতে ধান কাটা এখনো বাকি রয়েছে। শেষের দিকে বন্যায় ফসলের কিছুটা ক্ষতি হয়েও কৃষকরা দ্বিতীয় ধাপে চারা রোপণ করে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেন।

বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের কৃষক সুরুজ, আলতাব হোসেন বলেন, ফসল ঘরে আনার সাথে সাথেই আমাদের স্বপ্ন চলে আসে। ফসলের চারা লাগানোর এবং সাথে আমাদের ছোট ছোট স্বপ্নও বাড়তে থাকে। সফলের সবুজ বর্ণ যখন সোনালী বর্ণ ধারণ করে তখন আমাদের স্বপ্নের পূর্ণতা পায়। এবার ফলসে কিছুটা পোকার আক্রমণ দেখা দেখা দিয়েছিল। যার কারণে ফলন তুলনামূলকভাবে আগের বছরের থেকে কম হয়েছে। আমন ধান ঘরে আনার সময় আমাদের নবান্ন উৎসব শুরু হয়ে যায়। মূলত বাঙ্গালীর প্রাচীনতম উৎসব এটি। আমাদের ঘরের বউরা নতুন ধানের চাল দিয়ে নানান রকমের খাবার ও পিঠা তৈরি করে থাকে। এসময় আমাদের ঘরে মৃদু আনন্দে ভরে উঠে।

 

 

চৌধুরী বাড়ির সামনে ধান কাটারত কৃষক আসলাম, সালাম, মাহতাব বলেন, ফলন ভালো হয়েছে। আসা করছি ভালো দামে বিক্রি করতে পারব। আমাদের কষ্ট তখনই লাঘব হয়, যখন ফসলে সোনালী রূপ ধারণ করে। প্রতিবছর এইদিনে আমাদের মেয়ের জামাই আসে। তাদের বিভিন্ন আবদার ও খাবার তৈরিতে ব্যস্ত থাকে আমাদের গৃহিণীরা। বড়লোদের বিভিন্ন উৎসব থাকে আমাদের উৎসব এইটাই। এইটা আমাদের বাপ-দাদাদের উৎসব। পরবর্তী ফসল ঘরে তুলার আগ পর্যন্ত এই ফসলের টাকা দিয়ে আমাদের সংসার চালাতে হবে।

দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার পরেশ চন্দ্র দাস বলেন, এ মৌসুমে ফসলের বাম্পার ফলন হয়েছে। এখনো পর্যন্ত মাত্র ২০% ফসল কর্তন করা হয়েছে। যেটুকু লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল তার থেকে বেশী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়েছে। বন্যায় ফসলের কিছু ক্ষতি হলেও কৃষকরা তাদের সেই ক্ষতি পুষিয়ে তুলেন। কৃষকরা আগের থেকে বর্তমানে অনেক আপডেট হয়েছে। তাদের যেকোন প্রয়োজনে আমাদের পরামর্শ নিয়ে থাকে। আমরাও সাধ্যমত তাদের পরামর্শ দিয়ে থাকি। মাঠ পর্যায়ে কৃষদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করেন আমাদের বিচক্ষণ উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ।


মতামত জানান :

 
 
 
কপিরাইট © ময়মনসিংহ প্রতিদিন ডটকম - সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | উন্নয়নে হোস্টপিও.কম