সংবাদ শিরোনাম

 

স্টাফ রিপোর্টার, ময়মনসিংহ প্রতিদিন ডটকম : পৌষ সংক্রান্তির শেষ বিকেলে ফুলবাড়ীয়ার লক্ষীপুরের বড়ই আটায় চলে হুমগুটি খেলা। আর পৌষ মাসের শেষ দিনের এই দিনকে অত্র এলাকায় বলা হয় পহুরা। প্রায় দুই শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী এই খেলা হয় বছরে একবার একই স্থানে। পিতলের তৈরী গুটি করায়াত্ত করে নিজ গ্রামে নিয়ে গুম করা পর্যন্ত চলে এ খেলা। আর এ খেলাকে কেন্দ্র করে ফুলবাড়ীয়া উপজেলার গ্রামে গ্রামে চলে অন্যরকম উৎসাহ উদ্দিপনা । গোটা পরিবেশ হয়ে উঠে উৎসবমুখর।
ময়মনসিংহ-ফুলবাড়ীয়া সড়কের লক্ষীপুর ও দশ মাইলের মাঝা মাঝি বড়ই আটা বন্ধে (পতিত জমি) খেলার কেন্দ্রস্থল। ময়মনসিংহ সদর থেকে প্রায় ১৪কিলোমিটার। প্রতিবছরই বিকেল ৪ টার দিকে খেলার স্ত্রুপাত হয়। প্রচার বিহীন সকাল থেকে ফুলবাড়ীয়া ছাড়াও পাশ্ববর্তী ত্রিশাল ও মুক্তাগাছা উপজেলার লোকজন আসতে থাকে লক্ষীপুর বড়ই আটা বন্ধে। আসতে থাকা মানুষের সব পথ যেন একই দিকে। লাখো কন্ঠে উচ্চারিত হবে জিতই আবা দিয়া গুটি ধররে….হেইও।
ফুলবাড়ীয়া উপজেলা সদর থেকে ৫ কিলোমিটার উত্তরে লক্ষীপুরের বড়ই আটা বন্ধ। খেলা শুরুর পুর্বে ময়মনসিংহ-ফুলবাড়ীয়া সড়কের অদুরে ভাটিপাড়া, বালাশ্বর, তেলিগ্রামের সংযোগ স্থল নতুন সড়কে লোকে লোকারন্য হয়ে যায়।
গতকাল শুক্রবার ১৩ জানুয়ারী বাংলা ৩০ শে পৌষ জমজমাট হুমগুটি খেলাকে কেন্দ্রকরে ফুলবাড়ীয়ায় মেতে উঠে লক্ষাধিক মানুষ। জুমআর নামাজ শেষে লক্ষীপুর ঐতিহ্যের এক বিরল অনবদ্য পটভূমিতে খেলার আশপাশের গ্রামগুলোতে হাজার হাজার মহিলাও জড়ো হয়। যদিও তারা খেলার নাকাল পাবে না, তবুও দর্শক হিসেবে থাকার আনন্দ থেকে বাদ যেতে চায় না।
জানা যায়, মুক্তাগাছার জমিদার রাজা শশীকান্তের সাথে ত্রিশাল উপজেলার বৈলরের হেম চন্দ্র রায় জমিদারের জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। জমিদার আমলের শুরু থেকেই তালুকের প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল ১০ শতাংশে, পরগনার প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল সাড়ে ৬ শতাংশে। একই জমিদারের ভূ-খন্ডে দুই নীতির প্রতিবাদে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। জমির পরিমাপ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মিমাংসা কল্পে লক্ষèীপুর গ্রামের বড়ই আটা নামক স্থানে, যেখানে শুরুতালুক-পরগনার সীমানা, সেখানে এ গুটি খেলার আয়োজন করে। গুটি খেলার শর্ত ছিল গুটিটি যে দিকে যাবে তা হবে তালুক পরাজিত অংশের নাম হবে পরগনা । জমিদার আমলের সেই গুটি খেলায় মুক্তাগাছা জমিদারের প্রজারা বিজয়ী হয়। আজও তালুক পরগনার সীমান্তের জিরো পয়েন্টে ব্রিটিশ আমলে জমিদারী খেলার গোরাপত্তন। আমন ধান কাটা শেষ, বোর ধান আবাদের আগে প্রজাদের শক্তি পরীক্ষার জন্য জমিদারদের এই পাতানো খেলা চলছে বছরের পর বছর ধরে।
৪০কেজি ওজনের পিতলের গুটি ঢাক ঢোলের তালে তালে নেচে গেয়ে তালুক পরগনার সীমানায় নিয়ে আসে, ৩/৪ বছর আগে মানুষের পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছিল বলে এলাকাবাসী জানান । প্রতি বছর পৌষের শেষ বিকেলের এ খেলাকে ঘিরে অতি প্রাচীনকাল থেকেই লক্ষèীপুর, বড়ই আটা, ভাটিপাড়া বালাশ্বর, শুভরিয়া, কালীবাজাইল, তেলিগ্রাম, সারুটিয়া, গড়বাজাইল, বাসনা, দেওখোলা, কুকরাইল, বরুকা, ফুলবাড়ীয়া পৌর সদর, আন্ধারিয়াপাড়া, জোরবাড়ীয়া, চৌদার, দাসবাড়ী, কাতলাসেনসহ আশে পাশের ১৪/১৫টি গ্রামে শুরু হয় উৎসবের আমেজ। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা পড়ে নতুন জামা কাপড়, শতাধিক গরু-ছাগল জবাই হয় গ্রামের বিভিন্ন স্থানে। গুটি খেলা এক নজর দেখার জন্য দূরদূরান্তের আতœীয় স্বজনরাও ভীড় জমায় এ গ্রামে। এ খেলায় থাকে না কোন রেফারী বা আমপিয়ার। আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে কোন প্রকার বাহিনীর প্রয়োজন হয় না। বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে খেলা। কোন কোন বছর পরদিন পর্যন্ত খেলা চলার রেকর্ডও আছে। একেক এলাকার একেকটি নিশানা থাকে। ঐ নিশানা দেখে বুঝা যায় কারা কার পক্ষের লোক। গুটিটি কোন দিকে যাচ্ছে তা মুলত চিহিৃত করা হয় নিশানা দেখেই। নিজেদের দখলে নিতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয় খেলায়। এভাবে গুটিটি গুম না হওয়া পর্যন্ত চলে এ খেলা।
খেলা দেখতে লক্ষীপুরে আসেন জেলা পরিষদের নবাগত চেয়ারম্যান ইউছুফ খান পাঠান।  এ সময় জেলা পরিষদ সদস্য আলহাজ্ব তাজুল ইসলাম বাবলু, মো: রুহুল আমিন, আ’লীগ নেতা কেরামত আলী জিন্নাহ সঙ্গে ছিলেন।
স্থানীয় মুরব্বী মিয়া হোসেন (৫৮) জানান, বাপ-দাদারা বলতো তারাও দেখেছে খেলা চলে আসতে। মাইক মারতে (প্রচার) হয়না, সময়ও বলতে হয় না। আতœীয় স্বজনে বাড়ীঘর ভরা থাকে।
লক্ষীপুর গ্রামের বাসিন্দা ও ময়মনসিংহ জেলা অটো টেম্পু সিএনজি শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম বাবুল জানান, ২৫৮তম খেলা হবে এটি। আমরা সব সময় খেলা খেলে থাকি। স্থানীয় আবু বকর সিদ্দিক খেলাটি পরিচালনা করে থাকেন।


মতামত জানান :

 
 
আরও পড়ুন
 
কপিরাইট © ময়মনসিংহ প্রতিদিন ডটকম - সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | উন্নয়নে হোস্টপিও.কম