সংবাদ শিরোনাম

 

নিজস্ব প্রতিবেদক : সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহা। তিনি বলেন, অপরাধী যতো বড়ই হোক না কেন, সে দায়মুক্তি পাবে না। চাঞ্চল্যকর সাতখুনের মামলা প্রভাবশালী আসামি র‌্যাবের কতিপয় কর্মকর্তা ‘দায়মুক্তির মনোভাব নিয়ে’ (উইথ এটিচিউড অব ইমপিউনিটি) লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, যা সমগ্র জাতিকে স্তম্ভিত করেছে। সুপ্রিম কোর্টের সময়োপযোগী হস্তক্ষেপের ফলে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হয়। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে উক্ত মামলার বিচার নিস্পত্তি করায় বিচার বিভাগের প্রতি দেশের আপামর জনগণের আস্থা বেড়েছে।

দায়িত্ব গ্রহণের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে মঙ্গলবার (১৭ জানুয়ারি) প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এক বাণীতে একথা বলেন। ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন বিচারপতি এসকে সিনহা।

দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের উপর অন্য বিভাগগুলো হস্তক্ষেপ করবে না বলেও আশা প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের তিন বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য নীতির প্রতিফলন হচ্ছে সংবিধানের মূল চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিচার বিভাগ এর সীমার মধ্যে গিয়ে অন্য বিভাগের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। তেমনিভাবে আমিও প্রত্যাশা করি রাষ্ট্রের অন্যান্য বিভাগের দায়িত্ব পালনে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করবে না। প্রত্যেক বিভাগকে দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে অপরিহার্যভাবে সৃষ্ট শীতল সম্পর্ককে ইতিবাচক দৃষ্টিতে গ্রহণ করলে প্রত্যেক বিভাগের সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সমগ্র জনগোষ্ঠীর প্রভূত কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করবে।

দেশে বর্তমান মামলা জট নিরসনের পথে সেকেলে আইনকে বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধান বিচারপতি। তা সত্ত্বেও দায়িত্ব গ্রহণের পর দুই বছরে মামলা নিস্পত্তির পরিমাণ বেড়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধান বিচারপতি বলেন, বিগত দুই বছরে মামলা নিস্পত্তির বৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে, ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে দেশের সকল আদালতে ২৭ লাখ ৬০ হাজার ২৪০টি মামলা নিস্পত্তি হয়েছে। একই সময় ২০১৩ ও ২০১৪ সালে দেশের সকল আদালতে মামলা নিস্পত্তির পরিমাণ ছিল ২৪ লাখ ২৩ হাজার ৮৩৮। ফলে নিস্পত্তির হার শতকরা প্রায় ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

মামলাজট নিরসনের ক্ষেত্রে বিচারক সংকটের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশে বিচারকের সংখ্যা অত্যন্ত নগন্য। আমেরিকায় ১০ লাখ মানুষের জন্য ১০৭ জন, কানাডায় ৭৫ জন, ইংল্যান্ডে ৫১ জন, অস্ট্রেলিয়ায় ৪১ জন ও ভারতে ১৮ জন বিচারক রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে ১০ লাখ মানুষের জন্য মাত্র ১০ জন বিচারক রয়েছে। তদুপরি অবকাঠামোগত সুযোগ নাই। জনসংখ্যা ও মামলার সংখ্যা অনুপাতে বিচারক নিয়োগ করা এখন সময়ের দাবি।

তাই বিচারক নিয়োগে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, বর্তমানে আপিল বিভাগে ৮ জন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৮৯ জন বিচারক রয়েছেন। হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকগণের মধ্যে ৩ জন বিচারক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন। ৪ বিচারক গুরুতর অসুস্থ। ফলে বিভিন্ন সময়ে বেঞ্চ গঠনের সময় আমাকে হিমশিম খেতে হয়। এদের মধ্য হতে ২০১৭ সালে ৭ জন বিচারক অবসর গ্রহণ করবেন। ফলে বেঞ্চ গঠনে জটিলতা আরো প্রকট হবে। নিম্নআদালতে বিচারকের অনুমোদিত পদ ১৬৫৫। এদের মধ্যে ৩৮৭টি পদ শূন্য রয়েছে। অবশিষ্ট ১২৬৮ জন বিচারক দ্বারা নিম্নআদালতের ২৭ লক্ষাধিক মামলা নিস্পত্তি করা অসম্ভব। তাছাড়া প্রতিদিন নতুন মামলা দায়ের হচ্ছে। সংগত কারণে বর্তমান শূন্য পদে বিচারক নিয়োগ করা আবশ্যক। বিদ্যমান বিচারক সংখ্যা দ্বিগুণ করলে মামলা দায়ের এবং নিস্পত্তির ব্যবধান বহুলাংশে কমে আসবে বলে আমার বিশ্বাস।

জনবল সংকটের পাশাপাশি বিচারাঙ্গণে অবকাঠামোগত সংকটের কথাও তুলে ধরেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, ৪২টি জেলায় ম্যাজিস্ট্রেসি বিল্ডিং নির্মাণের প্রকল্প গৃহীত হয়েছে। ইতোমধ্যে ১২টি জেলায় নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি দুই-তিন মাসের মধ্যে আরো ১৭-১৮টি ভবনের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে। এতে আদালতের অবকাঠামোগত সমস্যা কিছুটা লাঘব হবে। তবে একথা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই যে, সমন্বয়হীনতার জন্য ম্যাজিস্ট্রেসি ভবন নির্মাণ কাজের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। আমি সংশ্লিষ্ট সকলকে ম্যাজিস্ট্রেসি ভবন নির্মাণ কাজ দ্রুত গতিতে সম্পন্ন করার জন্য আন্তরিকভাবে অনুরোধ জানাব।

একইভাবে সুপ্রিম কোর্টেও অবকাঠামোগত সংকটের কথা তুলে ধরেন প্রধান বিচারপতি। সংকটের কারণে সুপ্রিম কোর্ট ব্যাটালিয়ান পুলিশের কোনো স্থান নাই। লিগ্যাল এইড অফিসও স্বল্প পরিসরে স্থাপন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তাছাড়া সুষ্ঠু ও দ্রুত মামলা নিস্পত্তির জন্য প্রশিক্ষণের উপরও জোর দেন প্রধান বিচারপতি। সেজন্য ন্যাশনাল জুডিশিয়াল একাডেমি প্রধানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে ফরেনসিক ল্যাবরেটরি, ডিএনএ ল্যাবরেটরি, সাইবার ক্রাইম ডিটেকটিং ম্যাথড, ডিজিটাল এভিডেন্স রেকর্ডিং সিস্টেম ও আইটি বেজড ম্যানেজমেন্ট সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশে উচ্চ আদালতের বিচারকদের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের কয়েকজন বিচারপতি ভারতের ভুপালে অবস্থিত ন্যাশনাল জুডিশিয়াল একাডেমিতে স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।

একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক মধ্যমমানের ন্যাশনাল জুডিশিয়াল একাডেমি স্থাপনের জন্য সরকারকে ২৫ একর জমি বরাদ্দ প্রদানেরও অনুরোধ জানান তিনি।

তাছাড়া মামলা জট নিরসনের ক্ষেত্রে কিছু আইনজীবীর অযথা মূলতবীর দরখাস্ত এবং বিবিধ কারণ উল্লেখপূর্বক দরখাস্ত দাখিলকে দায়ী করেন প্রধান বিচারপতি। সেজন্য আইনজীবীদের সহযোগিতাও চান তিনি।

রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা বলেন, একথা দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করতে হবে যে, মিডিয়া ও বিচার বিভাগ এবং বিভিন্ন কার্যক্রম বিষয়ে সময়োপযোগী সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে নিরন্তর সহযোগিতা করে বিচার বিভাগের উন্নয়ন ও সংস্কারমূলক কাজ দ্রুত সম্পাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছে। তাই আমি দেশের সংবাদপত্র, সাংবাদিক, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াকে বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক সাধুবাদ।

মামলা জটের কারণ হিসেবে বিভিন্ন আইনের দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, আইনের নিরন্তর সংস্কার বিচার নিস্পত্তির জন্য অপরিহার্য। সে লক্ষ্যে শত বছরের অধিক পুরনো দেওয়ানী কার্যবিধি-১৯০৮, ফৌজদারী কার্যবিধি-১৮৯৮, সাক্ষ্য আইন ১৮৭২, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২, নেগোশিয়েবল ইনস্টুমেন্ট এক্ট ১৮৮১ একেবারেই সেকেলে। ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল, স্টে একুইজিশন এন্ড টেনান্সি এক্ট ১৯৫০ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪, এবং অর্থ ঋণ আদালত আইন ২০০৩ এ ত্রুটি রয়েছে। উক্ত আইনগুলোর দুর্বলতার কারণে মামলার সংখ্যা অযথা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট থেকে বিভিন্ন সময়ে জারি করা সার্কুলার ও প্রাকটিস ডিরেকশনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

সম্প্রতি অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি প্রণয়ন নিয়ে সরকারের সঙ্গে দ্বিমত অচিরেই দূরীভুত হবে বলে আশা করেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের প্রত্যেক বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য স্বতন্ত্র চাকরির বিধান রয়েছে। অধস্তন আদালতের বিচারকদের কাজের প্রকৃতি ও ধরন অন্যান্যদের চেয়ে স্বতন্ত্র। বিচারকদের শৃঙ্খলার বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকলে অধস্তন আদালতের বিচারকগণের পক্ষে স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে বিঘ্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সংগত কারণে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা প্রণয়ন করা আবশ্যক বিধায় এর খসড়া প্রণীত হয়েছে। অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণ সংক্রান্ত বিধিমালা গেজেটে প্রকাশের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে সামান্য বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও আশা করছি অচিরেই তা দূরীভূত হবে।

বিচার বিভাগের কাজকে গতিশীল করতে ডিজিটাইজেশনের জন্য গৃহীত পদক্ষেপগুলোও বাণীতে তুলে ধরেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, মামলা ব্যবস্থাপনায় সংস্কার ও দ্রুত সেবাদানের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারে কোনো বিকল্প নেই। সফটওয়ারের সহায়তায় কোনো মামলার তথ্য এখন সার্চ কমান্ড দিয়ে বের করা সম্ভব। তথ্য-প্রযুক্তির সর্বশেষ সুবিধাগুলো ব্যবহার করে সকল নাগরিকের কাছে তাদের পছন্দের ডিভাইসে মামলার তথ্য পাঠানোর কাজও নিশ্চিত করা কঠিন হবে না। বিচার ব্যবস্থা ডিজিটাইজেশনের পথে এরই মধ্যে আমরা কিছুটা এগিয়েও গিয়েছি।’

ডিজিটাইজেশনের ক্ষেত্রে অগ্রগতির উদাহরণ দিয়ে এসকে সিনহা বলেন, সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণে অঙ্গীকারাবদ্ধ। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এটুআই প্রোগ্রাম এর যৌথ উদ্যোগে বিচার বিভাগীয় বাতায়ন তৈরি করা হয়েছে। বিচার বিভাগের মনিটরিং বোর্ড তৈরি করা হচ্ছে। উচ্চ ও নিম্নআদালতে ই-কোর্ট ব্যবস্থা চালু, ডিজিটাল পদ্ধতিতে সাক্ষ্য ধারণ ও সংরক্ষণ, জেলাভিত্তিক ও কেন্দ্রীয় কারাগারের মধ্যে ভিডিও কনফারেন্সিং এর সুবিধা চালু, দেশের বিচার ব্যবস্থায় ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের প্রচলন এবং বিচারিক কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক তিন বছর মেয়াদী ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প গ্রহণ করার বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের উদ্যোগে অনেক এগিয়েছে। সরকারের সব বিভাগের কর্মকর্তা ও অধস্তন কর্মচারীরা কম্পিউটারের সুযোগ পেয়েছে কিন্তু জেলা জজ আদালতের বিচারকদের পর্যাপ্ত কম্পিউটার ও প্রিন্টার সরবরাহ করা হলে বিচার নিস্পত্তির পরিমাণ আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। সুপ্রিম কোর্ট এ সীমিত বাজেটের মধ্যেও দেশের বিভিন্ন আদালতে কম্পিউটার সরবরাহ করছে।

জেলা জজ পর্যায়ের বিচারকদের ছুটি ও কর্মস্থল ত্যাগের বিষয়টি সহজীকরণের লক্ষ্যে ই-এপলিকেশন সফটওয়ার চালুর বিষয়টি উল্লেখ করেন প্রধান বিচারপতি। এ পদ্ধতির মাধ্যমে অধস্তন আদালতের বিচারকদের ভোগান্তি বহুলাংশে প্রশমিত হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।


মতামত জানান :

 
 
আরও পড়ুন
 
কপিরাইট © ময়মনসিংহ প্রতিদিন ডটকম - সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | উন্নয়নে হোস্টপিও.কম