সংবাদ শিরোনাম

 

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ প্রতিদিন ডটকম : আজ ঐতিহাসিক একুশে ফেব্রুয়ারি। মহান ‘শহীদ দিবস’ এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। পাকিস্তান আমলে, ১৯৫২ সালের এদিন মায়ের ভাষা বাংলার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা সমুন্নত রাখার সংগ্রামে জীবন বিসর্জন দিয়েছিল বাঙালি জাতির সাহসী সন্তান সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বার। গৌরব আর বেদনার মিশ্র অনুভূতিতে জাতি আজ শহীদের বেদিতে ফুল দিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছে।

বাঙালির গৌরবগাঁথার চেতনা ধারণ করে বিশ্বপরিমণ্ডলে আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে মাতৃভাষার শক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দিনটিকে পালন করছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে।

‘বহুভাষা-ভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে টেকসই ভবিষ্যৎ-এর পথে’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ২০১৭ পালন করছে জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো।

দিবসটি পালন উপলক্ষে প্যারিসে ইউনেস্কো সদর দপ্তরে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সেমিনার, ওয়ার্কশপের আয়োজন করা হয়েছে। সদর দপ্তরের মূল কর্মসূচির সঙ্গে সংগতি রেখে দেশে দেশে দিবসটি পালনের জন্য নেয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে জাতির পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

রাত ১২টা ১টি মিনিটে প্রথমে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় অমর একুশের কালজয়ী গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ বাজানো হয়।

পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। পরে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রিবর্গ ও দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে দলের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

মন্ত্রিসভার সদস্যরা, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা, সংসদ সদস্যরা, তিন বাহিনীর প্রধান, কূটনীতিকরা, আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা এবং উচ্চ পদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। পরে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

এরপর আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতারা শহীদবেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। ১৪ দলের পর বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ দলীয় নেতাদের নিয়ে শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

বিরোধী দলীয় নেতার পর তিন বাহিনীর প্রধানরা পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে একুশের ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পরে পর্যায়ক্রমে কূটনীতিকরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি শহীদ মিনারে তাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন।
এরপরই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সহযোগী সংগঠন, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ছাত্র, যুব, শ্রমিক, কৃষক সংগঠনের নেতা-কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ একে একে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে শুরু করেন।

‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ স্লোগানে ‘স্বাধীন’ পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও শুরু থেকেই বাংলা ভাষার প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিমাতাসুলভ আচরণে বাঙালি সমাজ বুঝে গিয়েছিল এ রাষ্ট্র তার নয়। বাংলা ভাষার প্রতি উর্দুভাষী শাসকগোষ্ঠীর আচরণে বিভাগোত্তর তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের রাজধানী  ঢাকায় ১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভাষা-বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের মার্চে এ নিয়ে সীমিত পর্যায়ে আন্দোলন হয় এবং ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তার চরম প্রকাশ ঘটে।

ঐদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে বেরিয়ে এলে পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায়। এতে আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালামসহ কয়েকজন ছাত্রযুবা হতাহত হন। এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ ঢাকাবাসী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে সমবেত হয়। নানা নির্যাতন সত্ত্বেও ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানাতে পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি পুণরায় রাজপথে নেমে আসে। তারা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের জন্য অনুষ্ঠিত গায়েবি জানাজায় অংশগ্রহণ করে। ভাষাশহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য ২৩ ফেব্রুয়ারি এক রাতের মধ্যে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠে একটি স্মৃতিস্তম্ভ, যা সরকার ২৬ ফেব্রুয়ারি গুঁড়িয়ে দেয়। একুশে ফেব্রুয়ারির এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে ৯ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একুশে ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষিত হয়। এদিন শহীদ দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে রেডিও, টেলিভিশন এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। দেশের সংবাদপত্রগুলিও বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি যে চেতনায় উদ্দীপিত হয়ে বাঙালিরা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, আজ তা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

কানাডার ভ্যানকুভার শহরে বসবাসরত দুই বাঙ্গালী রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম প্রাথমিক উদ্যোক্তা হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানিয়েছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসঙ্ঘের সদস্যদেশসমূহে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে এখন থেকে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করবে জাতিসংঘ। – এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস হয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের প্রস্তাবটি সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে উত্থাপন করে বাংলাদেশ। পরে ১১৩ সদস্যবিশিষ্ট জাতিসংঘের তথ্যবিষয়ক কমিটিতে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাস হয়।


মতামত জানান :

 
 
আরও পড়ুন
 
কপিরাইট © ময়মনসিংহ প্রতিদিন ডটকম - সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | উন্নয়নে হোস্টপিও.কম