সংবাদ শিরোনাম

 

মনসুর হেলাল :

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন মূলত একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব; যে বিপ্লবের গভীরে প্রোথিত ছিল একটি জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার উন্মেষ, যা পরে একটি জাতিসত্তা তথা জাতীয়তাবাদী চেতনায় রূপ নেয়। যে চেতনাকে আবর্তিত করে সংগঠিত হয় একটি অধিকার বঞ্চিত জাতির আবেগ ও আবেদন, যার মাধ্যমে পূর্ণতা পায় হাজার বছরের পরিশীলিত বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ।
এ ভূখণ্ডের পরবর্তী রাজনৈতিক গতিশীলতা, অর্থনৈতিক মুক্তি, গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থান, স্বাধীনতা আন্দোলন এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবে ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার বিকাশ। সেই প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়েই চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত তৎকালীন ‘সীমান্ত’ পত্রিকার সম্পাদক মাহবুব উল আলম চৌধুরী রচনা করেন একুশের সেই অমর কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় ১৪৪ধারা ভঙ্গ করে ছাত্ররা যখন মিছিল নিয়ে বের হন, তখন পুলিশ সেই মিছিলে গুলি চালালে সালাম, বরকত, রফিকসহ অনেকেই প্রাণত্যাগ করেন।

পুলিশের গুলিতে ছাত্রদের প্রাণত্যাগের খবর চট্টগ্রাম পৌঁছলে এক বিষাদময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দুঃসহ মানসিক অবস্থায় বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে এ ঐতিহাসিক কবিতাটি রচিত হয়। তখন এ কবিতার কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী ছিলেন প্রচণ্ড জ্বরাক্রান্ত। কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেসে ওই রাতেই কবিতাটি ছাপা হয়। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে গভীর রাতেই পুলিশ প্রেসে হামলা করে। পুলিশের আগমন টের পেয়ে প্রেস কর্মচারীরা তড়িঘড়ি করে কম্পোজ করা ম্যাটার ভেঙে ফেলে ঠিকই কিন্তু ততক্ষণে প্রায় ১৫ হাজার কপি মুদ্রণ সম্পন্ন হয়েছিল। পর দিন ২২ ফেব্রুয়ারি লালদিঘি ময়দানে আয়োজিত বিশাল প্রতিবাদসভায় ওই কাব্যপুস্তিকা বিলি করা হয়। ঐতিহাসিক ওই জনসভায় কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনান ন্যাপ নেতা চৌধুরী হারুনুর রশীদ।

পরবর্তী সময়ে মুসলিম লীগ সরকার এক আদেশ বলে কাব্য পুস্তিকাটিকে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। এরপর বহু চেষ্টা সত্ত্বেও কবিতাটির ওপর সরকারের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা যায়নি। ১৯৫৪ সালে জনধিকৃত ৯২-ক ধারা জারি করে বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে রাখা কপিগুলোও পুলিশ নিয়ে যায়। এমনকি স্বয়ং মাহবুব উল আলম চৌধুরীর বাড়ি সার্চ করে অত্যন্ত গোপনে লুকিয়ে রাখা কয়েকটি কপিও পুলিশ নিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কবিতাটিকে আর পাওয়া যায়নি। দুঃখজনক হলেও সত্য, একুশের প্রথম কবিতা এভাবেই হারিয়ে গেল আমাদের কাছ থেকে। কবির স্মৃতি থেকে উদ্ধৃত কিছু পঙক্তি ড. রফিকুল ইসলামের ‘ভাষা আন্দোলন ও শহীদ মিনার’ প্রবন্ধ থেকে তুলে ধরা হলো-

এখানে যারা প্রাণ দিয়েছে
রমনার ঊর্ধ্বমুখী কৃষ্ণচূড়ার নিচে
যেখানে আগুনের ফুলকির মতো
এখানে ওখানে জ্বলছে রক্তের ছাপ
সেখানে আমি কাঁদতে আসিনি।
আজ আমি শোকে বিহ্বল নই,
আজ আমি ক্রোধে উন্মত্ত নই,
আজ আমি প্রতিজ্ঞায় অবিচল।
যে শিশু আর কোনোদিন তার
পিতার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ার
সুযোগ পাবে না,
যে গৃহবধূ আর কোনোদিন তার
স্বামীর প্রতীক্ষায় আঁচলে প্রদীপ
ঢেকে দুয়ারে আর দাঁড়িয়ে থাকবে না,
যে জননী খোকা এসেছে বলে
উদ্দাম আনন্দে সন্তানকে আর
বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবে না,
যে তরুণ মাটি কোলে লুটিয়ে
পড়ার আগে বারবার একটি
প্রিয়তমার ছবি চোখে আনতে
চেষ্টা করেছিল,
সে অসংখ্য ভাইবোনদের নামে
আমার হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত
যে ভাষায় আমি মাকে সম্বোধনে অভ্যস্ত
সেই ভাষা ও স্বদেশের নামে।
এখানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে
আমি তাদের ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।
যারা আমার অসংখ্য ভাইবোনকে
যারা আমার মাতৃভাষাকে নির্বাসন দিতে
চেয়েছে তাদের জন্য
আমি ফাঁসির দাবি করছি
যাদের আদেশে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে তাদের জন্য
ফাঁসির দাবি করছি
যারা এই মৃত দেহের উপর দিয়ে
ক্ষমতার আসনে আরোহণ করেছে
সেই বিশ্বাস ঘাতকদের জন্য।
আমি ওদের বিচার চাই
খোলা ময়দানে সেই নির্দিষ্ট জায়গাতে
শাস্তিপ্রাপ্তদের গুলিবদ্ধ অবস্থায়
আমার দেশের মানুষ দেখতে চায়।
পাকিস্তানের প্রথম শহীদ
সেই চল্লিশটি রত্ন
দেশের চল্লিশজন সেরা ছেলে
মা, বাবা, বৌ আর ছেলে নিয়ে
এই পৃথিবীর কোলে এক একটি
সংসার গড়ে তোলা যাদের
স্বপ্ন ছিল।
যাদের স্বপ্ন ছিল আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে
আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার
যাদের স্বপ্ন ছিল আণবিক শক্তিকে
কীভাবে মানুষের কাজে লাগানো যায়
শান্তির কাজে লাগানো যায়
তার সাধনা করার।
যাদের স্বপ্ন ছিল- রবীন্দ্রনাথের
‘বাঁশিওয়ালা’র চেয়েও সুন্দর
একটি কবিতা রচনা করার।


মতামত জানান :

 
 
আরও পড়ুন
 
কপিরাইট © ময়মনসিংহ প্রতিদিন ডটকম - সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | উন্নয়নে হোস্টপিও.কম