সংবাদ শিরোনাম

 

নিজস্ব প্রতিবদেক : স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় সংসদ। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে এদেশের নিরীহ ও ঘুমন্ত মানুষের উপর পরিচালিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অভিযানে নির্মম ও ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হওয়ার দিনটিকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনে সংসদে প্রস্তাব উঠলে শনিবার তা সর্বসম্মতক্রমে পাস হয়।

শনিবার বিকেল ৩টা ১১ মিনিটে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে শুরু হওয়া সংসদের বৈঠকে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন ফেনি-১ আসনের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের (একাংশ) এমপি শিরীন আখতার। তিনি ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা এবং আন্তর্জাতিকভাবে এ দিবসের স্বীকৃতি আদায়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের প্রস্তাব করেন। এ প্রস্তাবটি জাতীয় সংসদে উত্থাপনের পর এর উপর আলোচনা শেষে শনিবার রাতে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়। এর ফলে সরকারের নির্বাহী বিভাগ ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

শিরীন আখতার তার প্রস্তাবে উল্লেখ করেন ‘সংসদের অভিমত এই যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যাকে স্মরণ করে ২৫শে মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করা হউক এবং আন্তর্জাতিকভাবে এ দিবসের স্বীকৃতি আদায়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হউক।’পরে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা অনুমতি নিয়ে সংসদে সেই সময়ে বর্বরতার স্থিরচিত্র ও ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করেন।

প্রস্তাবের উপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমদে, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আমির হোসেন আমু, মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, ফজলে রাব্বী মিয়া, মহিউদ্দীন খান আলমগীর, ফারুক খান, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, শাজাহান খান, শাহরিয়ার আলম, তারানা হালিম, জুনাইদ আহমেদ পলক, নুরুজ্জামান আহমেদ, কর্নেল মীর শওকত আলী, ডা. দীপু মনি, আলী আশরাফ, আবদুল মতিন খসরু, আসাদুজ্জামান খান কামাল, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, ফজিলাতুন নেসা বাপ্পী, আবদুল মান্নান, মনিরুল ইসলাম মনি, বজলুল হক হারুন, আ.ফ.ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নুরুল ইসলাম সুজন, ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী, কাজী রোজী, আব্দুল মতিন, নুরুল মজিদ হুমায়ুন, তাজুল ইসলাম, কামাল আহমেদ মজুমদার, সাগুফতা ইয়াসমিন, হাজেরা খাতুন ও পঞ্চানন বিশ্বাস আলোচনা করেন।

জাতীয় পার্টির পক্ষে আলোচনা করেন দলটির প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, কাজী ফিরোজ রশিদ, জিয়াউদ্দিন বাবলু, ফখরুল ইমাম, নুরুল ইসলাম ওমর।

এছাড়া তরিকত ফেডারেশনের নজিবুল বশার মাইজভান্ডারী, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, ফজলে হোসেন বাদশা, জাসদের হাসানুল হক ইনু, মঈন উদ্দিন খান বাদল, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য তাহজীব আলম সিদ্দিকী বক্তব্য রাখেন।

শিরীন আখতার প্রস্তাবটি উত্থাপনের সময় তার বক্তব্যে বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাত্রিতে পাকিস্তানের বর্বর হানাদার বাহিনী কাপুরুষের মতো রাতের অন্ধকারে পাষবিক হিংসা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘুমন্ত বাঙালির উপর। সেদিন পাকিস্তানিরা আমাদের শুধু হত্যায়ই করতে চায়নি, বাঙালি জাতিসত্ত্বা হত্যা করার ব্রত নিয়ে অপারেশন চালিয়েছিল। পৃথিবীর এই জঘন্যতম গণহত্যার কোনো সাক্ষী যেন না থেকে সেজন্য বিদেশি সাংবাদিকদের পরদিন সকাল বেলায় বের করে দেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয় আজকে সুসভ্য বিশ্বসমাজ ও বিশ্বমানবতার অগ্রযাত্রার স্বার্থেও অন্তত একটি দিন গণহত্যার মতো পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য নির্বারিত থাকা প্রয়োজন। এরপর বর্ষীয়ান পার্লামেন্টিয়ান তোফায়েল আহমদের বক্তব্যের মাধ্যমে আলোচনার সূত্রপাত হয়।

তোফায়েল আহমেদ বলেন,‘আমাদের সশস্ত্রবাহিনী দিবস আছে, অন্যান্য দিবস আছে। যেহেতু মুক্তিযুদ্ধে ডিসেম্বর বিজয়ের মাস। পয়লা ডিসেম্বরকে আমরা মুক্তিযোদ্ধা দিবস হিসেবে পালন করতে পারি কি না, এটা বিবেচনা করার জন্য জাতীয় সংসদে উত্থাপন করছি।’

শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, আমি প্রস্তাব রাখতে চাই সিমলা চুক্তি অনুযায়ী ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধী তাদের যে বিচার করার কথা ছিল সেই বিচার পাকিস্তান করেনি। আন্তর্জাতিকভাবে মানবাধিকারের কথা বলেন তাদের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে বিশেষ করে জাতিসংঘের কাছে দাবি থাকবে তাদের বিচারের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। আন্তর্জাতিক আদালতে এসব রাজাকারদের বিচার করতে হবে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ডেভিড বার্গম্যান যিনি ড. কামালের জামাতা। যুদ্ধাপরাধের বিচার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সারা পৃথিবী তা দেখেছে। সাইমন ড্রিংসকে সম্মান জানাই। একুশে টিভিতে তিনি দায়িত্ব নিলে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে এ টিভি বন্ধ করে দেয় খালেদা জিয়া। শেষ যুদ্ধাপরাধীর বিচার করবো। বংশানুক্রমে বিচার হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, যে চেয়ারে বসে আছি সেখানে ৭১ এর ঘাতক বসেছিল। সেই ঘাতক আবার আসতে পারে। পৃথিবীর কোন দেশে আছে স্বাধীনতা বিরোধীরা রাজনীতি করে? বঙ্গবন্ধুর খুনিরাও রাজনীতি করেছে। খালেদা জিয়াকে চিরতরে পরাজিত করতে হবে। যাতে এই চেয়ারে বসতে না পারে।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, ২৫শে মার্চ গণহত্যা দিবসটিকে স্বীকৃতি দিলে বিশ্ব আমাদের ইতিহাস জানতে পারবে। আমাদের উচিত হবে, এই গণহত্যাকে আন্তর্জাতিকভাবে ক্যাম্পেইন করা।

জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ঢাকাবাসী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা সাক্ষী কীভাবে সেদিন গণহত্যা হয়েছিল। গণহত্যা দিবসটা পাস করা উচিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে পালনের জন্য চেষ্টা করা উচিত।

খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, বিএনপি নামক দলটি জামায়াতের ঔরষ থেকে জন্ম। তাই তাদের পক্ষে বলাই বিএনপির জন্য স্বাভাবিক।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছিলেন। ৭৫ পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে কারাগারে বন্দি ১১ হাজার কলাবরেটরকে ছেড়ে দিলেন। তাদেরকে সাংবিধানিকভাবে রাজনীতি করার সুযোগ দিলেন। জিয়ার মতোই তার পত্মী খালেদা জিয়া একই কাজ করছেন। এই প্রস্তাবের ফলে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে ২৫ মার্চ কি হয়েছিল। আগামীদিনে বাংলাদেশকে তারা সেভাবেই এগিয়ে নেবেন।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, পাকিস্তানের কাছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। তা আদায়ের জন্য আমরা উদ্যোগ নেব। অপারেশন সার্চ লাইটে কমপক্ষে ৫০ হাজার লোককে হত্যা করেছিল। যা পৃথিবীতে বিরল। এই জন্য ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস পালন করা উচিত। একইভাবে জাতিসংঘ ৯ ডিসেম্বরকে গণহত্যা দিবস পালন করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে বলবো যাতে ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিকভাবে গণহত্যা দিবস পালন করা হয় সে চেষ্টা করা হোক।

জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ দিনটিকে সরকারি ছুটি দাবি করে বলেন, পৃথিবীবাসী জানুক আমরা এই দিবসটি ভুলি নাই। এজন্য এই দিনটি সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হোক।

আলোচনা শেষে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস পালনের প্রস্তাবটি ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ ভোটে দেন স্পিকার। ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতক্রমে পাস হয়।


মতামত জানান :

 
 
আরও পড়ুন
 
কপিরাইট © ময়মনসিংহ প্রতিদিন ডটকম - সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | উন্নয়নে হোস্টপিও.কম