সংবাদ শিরোনাম

 

নিজস্ব প্রতিবেদক : বেসিক ব্যাংকের এত সমস্যা যে অন্যান্য ব্যাংকের সঙ্গে এর আলোচনা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেছেন, বেসিক ব্যাংক এখন ‘বিশেষ’ হয়ে গেছে। এর আলোচনাতেই সময় যায়, অন্যান্য আলোচনা আর করা যায় না।

রবিবার বিকালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বেসিক ব্যাংকসহ সাত সরকারি ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।

মূলধনের ঘাটতি পূরণে করণীয় নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে সরকারি সাতটি ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হলো সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)।  অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বিকাল সাড়ে তিনটায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বৈঠক শুরু হয়ে শেষ হয় ছয়টায়। সাত ব্যাংকের প্রতিনিধিরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

বেসিক ব্যাংক তার ঘাটতি পূরণে সরকারে কাছে দুই হাজার ৬০০ কোটি টাকা চেয়েছে, তা-ও বন্ড হিসেবে। অথচ সরকার সাত ব্যাংকের জন্য বরাদ্দ করেছে দুই হাজার কোটি টাকা। বেসিক ব্যাংকের এই চাহিদাকে অসম্ভব বলে বর্ণনা করেন অর্থমন্ত্রী।

এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘বেসিক ব্যাংক সম্পর্কে আমরা যথেষ্ট জানি। এটার দেনাদার কারা, কার দেনা কতটুকু সেটা সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য আছে।  বেসিক ব্যাংক বলে তাদের রি-কেপিটালাইজেশন এ রকম করতে হবে। এটা হতেই পারে না। এটা ইমপসিবল।’

নানা সমস্যায় ভারাক্রান্ত বেসিক ব্যাংকের পরিস্থিতির প্রতি ইঙ্গিত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বেসিক ব্যাংককে অন্যান্য ব্যাংকের সঙ্গে সমমানের বিচার করা যাবে না। বেসিক ব্যাংক কমপ্লিটলি আলাদা। এটি একটি বিশেষ ব্যাংক হয়ে গেছে। এই ব্যাংকের সমস্যা এককভাবে ডিল করতে হবে। এটাকে আলাদা ট্রিটমেন্ট করে ভালো অবস্থায় আনতে হবে।’

গত কয়েক বছরে বেসিক ব্যাংককে অর্থ লোপাটের খবর সংবাদ মাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। এর সঙ্গে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যানসহ কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। নামে-বেনামে নানাজনকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ঋণ দিয়ে ‘প্রায় শূন্য’ হয়ে পড়ে ব্যাংকের কোষাগার।

এ-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না সেটা জানতে আপনারা অপেক্ষা করুন। দেখেন কী হয়। এটা নিয়ে দুদকে রিপোর্ট গেছে।’

ঘাটতি পূরণে ব্যাংকগুলো যে দাবি তুলেছে সে সম্পর্কে বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আজকে সাতটি ব্যাংক যে দাবি-দাওয়া দিয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এগুলো নিয়ে আলোচনা চলবে। আলোচনার পরে সিদ্ধান্ত হবে।’

মন্ত্রী আরো জানান,  মূলধন ঘাটতির কিছু কিছু সব ব্যাংকই পাবে। তবে সেটা এখনই চূড়ান্ত নয়। পরবর্তী মাস থেকে বাজেটের দুই হাজার কোটি টাকা থেকে ক্যাপিটাল শর্ট ফল দেয়া শুরু হবে। তবে কাকে কতটুকু দেয়া হবে সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।’

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্র খাতের ব্যাংকগুলো চরমভাবে মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। সোনালী, বেসিক, কৃষিসহ পাঁচ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতির কারণে সরকার এর আগে ৮ হাজার কোটি টাকা নগদ দিয়েছে সাত ব্যাংককে। এ ব্যাংকগুলোই আবার নতুন কৌশলে চার হাজার ১০০ কোটি টাকা দাবি করছে। এবারের দাবি নগদ টাকা নয়, বন্ড। এসব বিষয় নিয়েই অর্থমন্ত্রী  আজ ব্যাংকগুলোর সঙ্গে  বিশেষ বৈঠক করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মূলত বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি ও খেলাপি ঋণ আদায় করতে না পারার কারণেই ব্যাংকগুলোতে মূলধন ঘাটতি বেড়েছে। ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যেই সোনালী, জনতা ও বেসিক ব্যাংক থেকে বেরিয়ে গেছে ১২ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে রূপালী, অগ্রণী ব্যাংকসহ বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর দুর্নীতির তথ্যও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন তদন্তে উঠে আসে। এর পরের তিন বছরে (২০১৪ থেকে ২০১৬) সরকার সোনালী, বেসিক, জনতাসহ সাত ব্যাংককে ৭ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা দেয়। এগুলো দেওয়া হয়েছে কখনো মূলধন ঘাটতি পূরণ, কখনো বা মূলধন পুনর্গঠন বা মূলধন পুনর্ভরণের নামে। এরপরও নতুন করে বেসিক, জনতা ও রূপালী ব্যাংক আরও ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা চেয়েছে।

বেসিক ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বেসিক ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের মার্চে তা দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। চার বছরে ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণ দেয়। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকাই নিয়ম ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অর্থ আত্মসাৎ নিয়ে গণমাধ্যমে লেখালেখি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা চিহ্নিত হলে সরকার ব্যাংক পুনর্গঠনে বাধ্য হয়।

প্রথমে ব্যাংকের এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করা হয়। ২০১৪ সালের ২৯ মে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই ধারাবাহিকতায় ৪ জুলাই অর্থমন্ত্রীর বাসায় গিয়ে পদত্যাগপত্র দেন শেখ আবদুল হাই বাচ্চু।

পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের ছয় কর্মকর্তাকে সাময়িক এবং সাতজনকে স্থায়ীভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তাদের মধ্যে সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এ মোনায়েম খান ও মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আলীর ব্যক্তিগত সম্পদ ও অন্যান্য বিষয়ে অনুসন্ধান শেষে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। তবে লুটপাটের মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

শেখ আবদুল হাই বাচ্চু দুই বছরের মধ্যে তিনটি শাখা থেকে ৪ হাজার ২৪৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ঋণ অনুমোদন করেন। ব্যাংকটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ১১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা ঋণ দেয়। অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে, কখনো বা বিতর্কিত সম্পত্তি এবং সম্পত্তির জাল দলিল বন্ধক রেখে বিধিবহির্ভূতভাবে ঋণ অনুমোদন করায় ঋণ রিকভারির কোনো সম্ভাবনা নেই।


মতামত জানান :

 
 
আরও পড়ুন
 
কপিরাইট © ময়মনসিংহ প্রতিদিন ডটকম - সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | উন্নয়নে হোস্টপিও.কম